আজ পবিত্র লাইলাতুল বরাত

ঢাকা: আজ দিবসের আলোকরেখা পশ্চিমে মিলিয়ে যাবার পরই শুরু হবে পরম কাঙ্ক্ষিত মহিমাময় রজনী, পবিত্র লাইলাতুল বারা’ত। শব-ই-বরাত।  মহিমান্বিত ভাগ্যরজনী। পাপ থেকে সর্বান্তকরণে ক্ষমা প্রার্থনা করে নিষ্কৃতি লাভের অপার সৌভাগ্যের রাত। বর্ণিত আছে যে, রাতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নূরের তাজাল্লি পৃথিবীর নিকট আসমানে প্রকাশ পায়। তখন আল্লাহপাক বলতে থাকেন-আছে কি কেউ ক্ষমা প্রার্থী? যাকে আমি ক্ষমা করব? আছে কি কেউ রিজিক প্রার্থী? যাকে আমি রিজিক প্রদান করব? আছে কি কেউ বিপদগ্রস্ত? যাকে আমি বিপদমুক্ত করব? আল্লাহ তায়ালার মহান দরবার থেকে প্রদত্ত এ আহ্বান অব্যাহত থাকে ফজর অবধি। বস্তুত, শব-ই-বরাত হলো আল্লাহ তায়ালার মহান দরবারে ক্ষমা প্রার্থনার বিশেষ সময়। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার নৈকট্য ও সান্নিধ্য লাভের এক দুর্লভ সুযোগ এনে দেয় লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান। অতএব, প্রতিটি কল্যাণকামী মানুষের প্রধানতম কর্তব্য হলো এ সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করা। মহান আল্লাহ’র ইবাদত-বন্দেগিতে নিমগ্ন হয়ে রাত অতিবাহিত করা। তাত্পর্যপূর্ণ এই রাতে বিশেষ বরকত হাসিলের জন্য মুসলিম সমপ্রদায় নফল নামাজ আদায় ও কোরআন তেলাওয়াত, ইস্তেগফার, ইবাদত-বন্দেগি, জিকির-আসকার, তাসবিহ-তাহলিল, দোয়ায় মশগুল থাকেন।

শব-ই-বরাতকে ‘লাইলাতুল বারাআত’ নামে অভিহিত করা হয়। ‘লাইলাতু’ একটি আরবী শব্দ, আর ‘শব’ শব্দটি ফারসী। দুইটি শব্দের অর্থই হ’ল রাত। অপর পক্ষে’ ’বারাআত’ শব্দের অর্থ হ’ল- নাজাত, নিষ্কৃতি বা মুক্তি। এ রাতে বান্দারা মহান আল্লাহ তায়ালার নিকট থেকে মার্জনা লাভ করে থাকেন। এ কারণে এ রাতকে ‘লাইলাতুল বারাআত’ বা শব-ই-বরাত বলা হয়। শাবান মাসের মধ্যবর্তী রাতে পবিত্র শব-ই-বরাত পালিত হয়। এ ব্যাপারে কুরআন শরিফে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকলেও হাদীস শরীফে এটাকে লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান বা মধ্য শাবানের রাত্রি নামে অভিহিত করা হয়েছে। এর পক্ষকাল পরেই আসবে রহমত বরকত নাজাতের মাহে রমজান (১৯ জুন প্রথম রোজা) । একারণে এটাকে বলা হয় রমজানের মুয়াজ্জিন।

লাইলাতুল বারাআত মাসব্যাপী প্রশিক্ষণের পূর্বপ্রস্তুতিস্বরূপ। ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রকাশিত ইসলামী বিশ্বকোষ গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে যে, “ইরান ও ভারতীয় উপমহাদেশে এ মাসের একটি রজনীকে ‘শব-ই-বরাত’ বলা হয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কোন কোন দেশের কোন কোন এলাকায় শব-ই বরাত ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত। আরববাসীরা এ রাতকে ‘লাইলাতুন নিসফে মিন শাবান’ বলেন।

এ রাতে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে নফল নামাজ পড়া, যাতে সেজদাও দীর্ঘ হবে, শরীয়তের দৃষ্টিতে এটাই কাম্য। নফল নামাযের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী দুই রাকআত করে যত রাকআত সম্ভব হয় পড়তে থাকা। কুরআনুল কারীম তেলওয়াত করা। গভীর ধ্যানে বেশি বেশি দরূদ শরীফ পড়া। ইসেতগফার করা। দুআ করা। তাসবিহ তাহলিল, জিকির আসকার করা। আর সঙ্গে সঙ্গে অবশ্যই নিজের জন্য, নিজের পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি, আত্ময়ী-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া প্রতিবেশী ও সব মুসলমানদের জন্য বেশি বেশি দোয়া করা, তাওবা ও ক্ষমাপ্রার্থনা করা। সম্ভব হলে পুরুষের জন্য কবরস্থানে গিয়ে কবর জিয়ারত করা, কবরবাসীদের জন্য দোয়া করাও সওয়াবের কাজ।

এ রাতের নফল আমলসমূহ বিশুদ্ধ মতানুসারে একাকীভাবে করণীয়। ফরয নামায জামায়াতের সঙ্গে অবশ্যই মসজিদে আদায় করতে হবে। তবে নফল আমলের জন্য দলে দলে মসজিদে এসে সমবেত হওয়ার কোন প্রমাণ হাদীস শরীফেও নেই আর সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন-তাবে তাবেঈনদের যুগেও এর রেওয়াজ ছিল না। তবে এমনিই কিছু লোক যদি মসজিদে এসে যায়, তাহলে প্রত্যেকে নিজ নিজ আমলে মশগুল থাকবে, একে অন্যের আমলের ব্যাঘাত সৃষ্টির কারণ হবেন না।

লাইলাতুল বরাতের ফজিলত সম্পর্কে বলা হয়েছে, বরকতময় এ রাতে মুমিনদের প্রতি আল্লাহ’র বিশেষ অনুগ্রহ বর্ষিত হয়। মানুষের আমল আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়।

এই রাতেই পরবর্তী বছরের মৃত্যুবরণকারী মানুষ এবং পরবর্তী বছরের জন্মগ্রহণকারী শিশুদের তালিকা করা হয়।

উলামা মাশায়েখগণ বলেন, এ রাতে হালুয়া-রুটি, ফিন্নী-পায়েশ, খিচুড়ি, বিরিয়ানি প্রভৃতি বিতরণ বাধ্যতামূলক নয়। আলোকসজ্জা, হালুয়া-রুটি আর আতশবাজির মেলা এ রাতের পবিত্রতায় আঘাত হানে। কারণ উত্সব নয়, কেবল প্রার্থনার রাত ‘শব-ই-বরাত’।

যথাযথ মর্যাদায় ধর্মীয় ভাবগম্ভীর পরিবেশে আজ পবিত্র শব-ই-বরাত উদযাপিত হবে। এ উপলক্ষে রাজধানীসহ দেশের প্রতিটি মসজিদে ওয়াজ মাহফিল, জিকির-আজকারের আয়োজন করা হয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন আলোচনা এবং মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করেছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে আজ রাতভর ওয়াজ মাহফিল, জিকির-আজকারের ব্যবস্থা করেছে। বাদ এশা থেকে বিশিষ্ট ওলামায়ে কেরামগণ ওয়াজ করবেন। ফজরের নামাজ শেষে ভোরে মোনাজাত পরিচালনা করা হবে।

শব-ই-বরাত উপলক্ষে কাল সরকারি ছুটি। এ রাতের তাত্পর্য তুলে ধরে রেডিও-টেলিভিশনে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করা হবে। সংবাদপত্র প্রকাশ করবে বিশেষ ক্রোড়পত্র।

এই উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি এডভোকেট আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া পৃথক পৃথক বাণীতে পবিত্র শব-ই-বরাতের শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সবার প্রতি মানব কল্যাণে ও দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করার আহ্বান জানান।

আতশবাজি, পটকাবাজি নিষিদ্ধ

রাজধানীতে মঙ্গলবার দিবাগত রাতে পবিত্র শব-ই-বরাত উদযাপন উপলক্ষে মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত ক্ষার জাতীয় বা বিস্ফোরক দ্রব্য, আতশবাজি, পটকাবাজি, অন্যান্য ক্ষতিকারক ও দূষণীয় দ্রব্য বহন এবং ফোটানো নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া ডিএমপি অর্ডিন্যান্স ২৮ ধারায় অর্পিত ক্ষমতা বলে এ নির্দেশ দেন।

Print
2397 মোট পাঠক সংখ্যা 1 আজকের পাঠক সংখ্যা

About Jessore Express

Close