বরিশালে ইলিশ নিয়ে বিপাকে ব্যবসায়ীরা

যশোর এক্সপ্রেস ডেস্ক:  হঠাৎ করেই বরিশালে বরফ কলগুলো বন্ধ করে দিয়েছেন কল মালিকরা। এতে বিপাকে পড়েছেন মৎস্য বাবসায়ীরা। তিনদিন ধরে মাছের পচন রোধ করতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। তাই বিকল্প ব্যবস্থায় খুলনা থেকে বরফ সরবরাহ করছেন ব্যবসায়ী, আড়তদার ও বরফ ক্রাশকল মালিকরা। দাম বৃদ্ধি আর চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ বরফ সরবরাহ করায় প্রয়োজনের তাগিদেই বরিশালের বাইরে থেকে বরফ আনছেন বলে দাবি করেছেন তারা। দ্রুত এ সমস্যার সমাধান না হলে ইলিশ মাছে পচন ধরে লোকসান গুণতে হবে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তবে বাইরের জেলা থেকে বরফ আনা ও তৈরিতে খরচ বেড়ে যাওয়ায় লোকসান হচ্ছে বলে বরফ কল বন্ধ রেখেছে বলে জানিয়েছেন বরফ কল মালিক সমিতি। তবে পাইকার ও মৎস্য ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করে বলেন, প্রতি বছর ইলিশের ভরা মৌসুমের সময় সিন্ডিকেট করে বরফ-কল মালিকরা এমন সংকট তৈরি করেন।

আর বরফ কল মালিকদের জিম্মি দশা থেকে রেহাই পেতে এ বছর খুলনা ও সাতক্ষীরা থেকে ট্রাকে করে বরফ আনছেন বলে জানান বরফ ক্রাশকল মালিক সমিতির সভাপতি মো. হারুন সিকদার। তিনি জানান, ইলিশের প্রজনন মৌসুমের নিষেধাজ্ঞা শেষে ১০ অক্টোবর থেকে বরিশাল পোর্ট রোডের মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে প্রচুর মাছ আসছে। প্রতিদিন দেড়/দুই হাজার ক্যান বরফের চাহিদা থাকলেও এর অর্ধেকটা সরবরাহ করে থাকেন কল মালিকরা। তিনি জানান, বাড়তি লাভের আশায় চালু থাকা কলগুলোর মধ্যে একটি বা দু’টি কল চালু রাখায় চাহিদা অনুযায়ী তারা বরফ সরবরাহ করতে পারছেন না। অপরদিকে চাহিদা দেখে ১৫০ টাকা বরফ ক্যান ২০০ টাকা করে বিক্রি করছেন বরফ কলের মালিকরা। এ ছাড়াও বরফ পাতলা করায় ওজনেও কম হচ্ছে। ফলে বরফ বিক্রি করতে গিয়ে লোকসান গুণতে হচ্ছে তাদের। এ বিষয়ে ক্রাশকল দোকানের ব্যবসায়ী মো. মাসুম জানান, বর্তমানে বরফ ভাঙার কাজে যে সব ব্যবসায়ীরা রয়েছেন তারা এ অবতরণ কেন্দ্রের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে খুলনা থেকে বরফ সরবরাহ করছেন।

তিনি আরো জানান, বরিশালে যে বরফ ক্যান ২৫০ টাকায় কেনা হয় তা তারা বর্তমানে ১৯০ টাকায় সরবরাহ করছেন। অপর ব্যবসায়ীরা জানান, বরিশালে মাছের চাপ বাড়ার পর বরফ কল ব্যবসায়ীরা আশানুরুপ বরফ উৎপাদন করতে পারেননি। আর যে বরফ তারা বাজারে বিক্রি করছেন তা তেমন মানসম্মত ছিলোনা। বরিশালের মৎস্য আড়তদার ও পাইকার ব্যবসায়ী নাছির হোসেন জানান, বরিশালে বরফ কল মালিকরা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বরফ উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছেন। বরিশাল থেকে বরফ না পেয়ে কোটি কোটি টাকার মাছ রক্ষায় তারা বাইরে থেকে বরফ আনছেন। তবে তার পরও বরফ সংকট থেকে যাচ্ছে। মাছের পচন রোধ করতে এর চেয়ে অন্য কোনো পন্থা কারো যানা নেই। আর এ সমস্যার সমাধান না হলে মৎস্যজীবীসহ ব্যবসায়ীদের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। আড়তদার দুলাল ফরাজী জানান, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা না করে হঠাৎ করেই বরফ উৎপাদন বন্ধ করে দেয় মালিকরা। এ কারণে প্রথম দিনে প্রায় ৫ কোটি টাকার মাছ নষ্ট হয়ে যেত যদি তাৎক্ষণিক খুলনা থেকে বরফ আনা না হতো। আর এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসায়ীরা ক্ষতির সম্মুখিন হবেন বলে জানান তিনি।

বরিশাল জেলা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ইজারাদার নীরব হোসেন টুটুল জানান, বরিশালে ৮টি বরফ কল সচল রয়েছে। যা থেকে ২ হাজার ক্যান বরফ উৎপাদন সম্ভব। আর বাজারে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার মণ মাছ সরবরাহ হওয়ায় ১২ থেকে ১৩শ’ ক্যান বরফের প্রয়োজন রয়েছে। তবে বর্তমানে মাত্র ২/১টি বরফ কল বরফ উৎপাদন করছে। যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম।
কিন্তু নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পরের দিন থেকে প্রচুর ইলিশের সরবরাহ ঘটলেও তারা বরফ উৎপাদন কমিয়ে দেয় এবং ১১ অক্টোবর রাত থেকে বরফ কল মালিক সিন্ডিকেটের সদস্যরা তাদের কলগুলো বন্ধ করে দেয়।  ফলে এই অবতরণ কেন্দ্রে কোটি টাকার মাছ নষ্ঠ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলে ব্যবসায়ীরা খুলনা থেকে বরফ সরবরাহ শুরু করেন। এখন পর্যন্ত খুলনা থেকেই বরফ সরবরাহ করা হচ্ছে। এদিকে ক্ষতির কথা বিবেচনা করে উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বরফ কল মালিক সমিতির নেতারা।
বরফ কল মালিক সমিতির সদস্য ফারুক সিকদার জানান, বরিশালে একসময় ৪২টি বরফ কল ছিলো কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা এখন কমে ৮টিতে এসে দাঁড়িয়েছে। গুটি কয়েক লোকের কাছে মৎস্য ব্যবসায়ীরা জিম্মি হয়ে যাওয়ায় এ বাজারের ব্যবসায়ীক অবস্থা বর্তমানে ভালো নেই। বর্তমানে আশানুরুপ মাছ আসছে এ ঘাটে।

তিনি আরো জানান, ৭ লাখ টাকার বরফ উৎপাদনের জন্য যদি ১১ লাখ টাকার বিদ্যুৎ বিল দিতে হয় সেক্ষেত্রে ক্ষতির কথা চিন্তা করেই তারা বরফ উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছেন। বরফকল মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দ জানান, নিষেধাজ্ঞার আগ পর্যন্ত ৬ মাস তাদের বরফ-কলগুলো অনেকটা বন্ধ রাখতে হয়েছে। এখন প্রচুর মাছ ধরা পড়ায় কল চালু করলেও কিছু ক্রাশকল ব্যবসায়ী ও কতিপয় পাইকাররা তাদের স্বার্থে বরিশালের বাইরে থেকে বরফ আনছেন। এতে তাদের লোকসান গুণতে হয় বলে বরফ-কল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মালিক সমিতি। তবে বরিশাল জেলার একমাত্র বৃহৎ এই মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে মৎস্য সরবাহের উৎপাদন কমে যাওয়ার বিষয়টিতে দ্বিমত পোষণ করেছেন মৎস্য অধিদপ্তর। বরিশাল জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের মৎস্য কর্মকর্তা ইলিশ বিমল চন্দ্র দাস জানান, আগের চেয়ে এ অবতরণ কেন্দ্রে মাছ সরবরাহ কিছুটা কমে আসলেও এখনো পুরো দক্ষিণাঞ্চলে ইলিশের সবচেয়ে বড় মোকাম এটি। মিঠা পানির ভালো মানের মাছ এ মোকামেই এখনো বেশি পাওয়া যায়। মানসিক দ্বন্দ্বের কারণে এক পক্ষ অপর পক্ষকে দোষ দিচ্ছে। তিনি জানান এ বিষয়টি নিয়ে সমাধানের জন্য দুই পক্ষকে নিয়ে আলোচনায় বসার চেষ্টা করছেন তারা।
বরিশালে আজ এলসি সাইজের (৬০০ থেকে ৯ ০০ গ্রাম) মাছ মণ প্রতি ৩০ হাজার টাকা, ১ কেজি সাইজের মাছ ৩৮ হাজার টাকা, ৩০০ থেকে ৬০০ গ্রাম সাইজের মাছ ২২ হাজার টাকা ও জাটকা ৮ থেকে ১২ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

Print
800 মোট পাঠক সংখ্যা 1 আজকের পাঠক সংখ্যা

About Jessore Express

Close