ছবি: সংগৃহীত

যশোর আদ-দ্বীন হাসপাতালে ক্রুটিপূর্ণ চিকিৎসায় প্রসূতির মৃত্যু

যশোর এক্সপ্রেস ডেস্ক: যশোরে আদ-দ্বীন হাসপাতালে পলি বেগম নামে এক প্রসূতির মৃত্যু হয়েছে। তার স্বজনরা অভিযোগ করছেন, হাসপাতাল কর্তৃপরে ক্রুটিপূর্ণ চিকিৎসা, অব্যবস্থাপনা এবং প্রকৃত ঘটনা চেপে যাওয়ার কারণে ওই গৃহবধূর অকাল মৃত্যু হয়েছে। খবর পেয়ে মৃত গৃহবধূর স্বজনসহ এলাকাবাসী এসে হাসপাতালটির সামনে জড়ো হন। হাসপাতাল কর্তৃপ স্বীকার করেছেন, রোগী মৃত্যুর জন্য ডাক্তার ও নার্সের অবহেলা আছে। অঘটন ঘটতে পারে আশঙ্কায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের
কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে অবস্থান নেয়। ঘিঞ্জি, অপরিচ্ছন্ন, অপরিসর কে অস্ত্রোপচারের রোগী রাখার কারণে এর আগেও এই হাসপাতালটিতে রোগী মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। কর্তৃপ এই অভিযোগ কবুল করে নিয়ে বলছেন, তারা হাসপাতালের টিনশেড ভবনটি ভেঙে শহরতলীতে সুপরিসর হাসপাতাল নির্মাণ প্রক্রিয়া শুরু করেছেন।
পলি বেগম (২৫) যশোর শহরতলীর বালিয়াডাঙ্গা এলাকার মনির হোসেন মিন্টুর স্ত্রী। গৃহবধূর শাশুড়ি শাহানারা বেগম জানান, অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার তিন মাস পর পলিকে আদ-দ্বীন হাসপাতালের তত্ত্বাবধানে নিয়মিত চেকআপ করানো হতো। রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ায় শনিবার তাকে আদ-দ্বীন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সোমবার হাসপাতাল কর্তৃপ তাকে রিলিজ করে দেন। মঙ্গলবার সকালে প্রসব বেদনা উঠলে নয়টার দিকে তাকে হাসপাতালে আনা হয়। পরে ডা. জাহিদ হোসেনের তত্ত্বাবধানে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে পলির একটি কন্যাসন্তান জন্ম হয়। শাহানারা বেগম অভিযোগ করেন, অস্ত্রোপচারের পর থেকেই পলির অবস্থা আশঙ্কাজনক ছিল। কিন্তু ডাক্তার বা হাসপাতাল কর্তৃপ বিষয়টি গোপন রাখেন। তাদের অবহেলার কারণেই তরুণী বধূ পলির অকাল মৃত্যু হয়েছে বলে শাশুড়ি শাহানারার অভিযোগ।
পলির ফুপা মো. দুলাল হোসেন অভিযোগ করে বলেন, ‘ডাক্তার জাহিদ অস্ত্রোপচারের পর রোগিনীর শরীর থেকে রক্তরণ বন্ধ হচ্ছিল না। কর্তব্যরত সেবিকারা বার বার কাপড় দিয়ে রক্ত মুছে ফেলেন। তবে তা রোগীর স্বজনদের জানতে দেওয়া হয়নি। অস্ত্রোপচারে মারাত্মক ক্রুটির কারণে রক্তরণ হয়েছে এবং বিষয়টি জানাজানি হলে সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে বিধায় কর্তৃপ বিষয়টি গোপন রাখেন।’ পলির ভাগ্নে কামাল হোসেন জানান, রোগীমৃত্যুর মাত্র আধাঘণ্টা আগে সেবিকারা তাদের জানান, এখনই আট ব্যাগ রক্ত লাগবে। তা না হলে রোগীকে বাঁচানো যাবে না। কিন্তু এর আগে শরীর থেকে সব রক্ত বেরিয়ে রোগী মৃত্যুদশায় পতিত হলেও তাদের কিছুই জানানো হয়নি। চিকিৎসায় গুরুতর ক্রুটি, অবহেলা ও কর্তৃপরে দায়িত্বহীনতার কারণে পলির মৃত্যু হয়েছে জেনে তার স্বজন ও এলাকার শতাধিক লোক বুধবার দুপুরে আদ-দ্বীন হাসপাতালের সামনে জড়ো হন। রোগীমৃত্যুর জন্য তারা হাসপাতাল কর্তৃপকে দুষতে থাকেন।
এ সময় হাসপাতালটির চেয়ারম্যান মো. আবেদ আলী ুব্ধ লোকজনের অভিযোগ কবুল করে নেন। তিনি বলেন, ‘প্রসূতি মৃত্যুর জন্য ডাক্তার ও সেবিকাদের কিছু অবহেলা আছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তবে হাসপাতালটির ম্যানেজার শাহিনা ইয়াসমিন রোগী মৃত্যুর দায় নিতে চাননি। তিনি দাবি করেন, রোগীর রক্তচাপ ও শ্বাসকষ্ট ছিল। মঙ্গলবার রাতে তার শরীর থেকে রক্তরণ হয়েছে। রক্ত আনতে বললে প্রসূতির স্বজনরা ফ্রিজে রাখা রক্ত এনে দেন। ওই রক্ত ব্যবহার করা যায়নি। সে কারণে পলি বেগমের মৃত্যু হয়েছে। এখানে চিকিৎসক-সেবিকাদের কোনো অবহেলা ছিল না বলে তিনি দাবি করেন। অভিযুক্ত ডাক্তার জাহিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। আদ-দ্বীন কর্তৃপকে অনুরোধ করা হলেও তারা ডা. জাহিদের নাম্বার দিতে অস্বীকার করেন।
এদিকে, শতাধিক লোক হাসপাতালটির সামনে জড়ো হওয়ায় আদ-দ্বীন কর্তৃপ আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তাদের কাছ থেকে খবর পেয়ে কোতয়ালী থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পলির স্বজন ও এলাকাবাসী পুলিশের কাছেও তাদের নালিশ জানান। কোতয়ালী থানার ওসি শিকদার আককাছ আলী বলেন, ‘ঘটনা জানতে পেরে আমি একজন অফিসারের নেতৃত্বে আদ-দ্বীন হাসপাতালে পুলিশ পাঠাই। পরিস্থিতি এখন শান্ত আছে। রোগীর স্বজনরা যদি আইনি ব্যবস্থা নিতে চায়, তাহলে তা গ্রহণ করা হবে।’ প্রসঙ্গত, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত শহরের রেল রোডে অবস্থিত আদ-দ্বীন হাসপাতালের চিকিৎসার মান, পরিবেশ, চিকিৎসক ও সেবিকাদের আচরণ নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে। সংকীর্ণ, প্রায় বদ্ধ, আলো-বাতাসহীন, অপরিচ্ছন্ন কে অস্ত্রোপচারের রোগীদের রাখা হয়। ফলে প্রায়ই জীবাণু সংক্রমণের কারণে রোগী মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এছাড়া অদ ডাক্তারদের ক্রুটিপূর্ণ চিকিৎসার অভিযোগ তো রয়েছেই।
জানতে চাইলে আদ-দ্বীনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম অপরিচ্ছন্ন, সংকীর্ণ ওয়ার্ডে রোগী রাখার কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, হাসপাতালের টিনশেড ভবনটি ভেঙে ফেলা হবে। শহরতলীর পুলেরহাটে সুপরিসর হাসপাতাল নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে বলে তিনি জানান।
তবে ‘ক্রুটিপূর্ণ চিকিৎসা, চিকিৎসক ও নার্সদের অবহেলার বিষয়টি ঠিক নয়’ দাবি করে তিনি বলেন, ‘রোগীর মৃত্যু হলে স্বজনরা অনেক সময় এমন অভিযোগ তোলেন। পলির মৃত্যুর পরও একই অভিযোগ তুলেছেন তার স্বজনরা।’ ‘এই হাসপাতালে এখন চিকিৎসার মান আগের চেয়ে অনেক ভালো। প্রফেসররাও এখন রোগী দেখেন’ দাবি করেন রবিউল ইসলাম। শেষ খবরে জানা যায়, মৃত পলির সদ্যোজাত কন্যাসন্তানটি সুস্থ আছে।

Print
1151 মোট পাঠক সংখ্যা 1 আজকের পাঠক সংখ্যা

About Jessore Express

Close