সরকারকে ‘চাপে ফেলতে’ তাভেল্লা হত্যা

যশোর এক্সপ্রেস ডেস্ক: সরকারকে চাপে ফেলার জন্য ‘বাংলাদেশে বিদেশিরা নিরাপদ নয়’ বোঝাতে ‘কোনো একজন শ্বেতাঙ্গকে’ হত্যা পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই গুলশানের কূটনৈতিক এলাকায় ইতালির নাগরিক চেজারে তাভেল্লাকে খুন করা হয় বলে দাবি করেছে পুলিশ। গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, তাভেল্লার ‘তিন হত্যাকারী’সহ চারজনকে গ্রেপ্তারের পর তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে ‘বিদেশি হত্যার এই ষড়যন্ত্রের’ বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছেন তারা।

রাসেল চৌধুরী ওরফে চাকতি রাসেল, মিনহাজুল আরেফিন রাসেল ওরফে ভাগ্নে রাসেল ওরফে কালা রাসেল, তামজিদ আহম্মেদ রুবেল ওরফে শুটার রুবেল এবং শাখাওয়াত হোসেন ওরফে শরীফ নামের এই চারজনকে রোববার ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। সোমবার তাদের হাজির করা হয় পুলিশের গণমাধ্যম কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সামনে। ঢাকার পুলিশ কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, কথিত এক বড় ভাইয়ের নির্দেশে ‘নির্দিষ্ট টাকার চুক্তিতে’ দুই রাসেল ও রুবেল এই হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়। আর এ কাজে তারা শরীফের মোটরসাইকেল ব্যবহার করে।

“চেজারে তাভেল্লা টার্গেট ছিলেন না। নৈরাজ্য তৈরি করে আন্তর্জাতিকভাবে সরকারকে চাপে ফেলার অপকৌশল হিসেবে এ্ই হত্যার ঘটনা ঘটানো হয়েছে।” কথিত সেই বড় ভাইয়ের কোনো ‘রাজনৈতিক পরিচয়’ পুলিশ কমিশনার জানাননি। তবে বিএনপি-জামায়াত জোটের দিকে ইংগিত করে তিনি বলেছেন, বছরের শুরুতে যারা ‘মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করেছে’, তারা এ ঘটনায় যুক্ত কি না- তা পুলিশ খতিয়ে দেখছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতারাও এতোদিন এ ধরনের ইংগিতই দিয়ে আসছিলেন।

গত ২৮ সেপ্টেম্বর গুলশানের সড়কে তাভেল্লাকে গুলি চালিয়ে হত্যা করা পালিয়ে যায় মোটর সাইকেল আরোহী দুর্বৃত্তরা। আইসিসিও কো-অপারেশন নামে একটি সংস্থার প্রুফ (প্রফিটেবল অপরচ্যুনিটিজ ফর ফুড সিকিউরিটি) কর্মসূচির প্রকল্প ব্যবস্থাপক ছিলেন ইতালির এই নাগরিক, ঢাকায় তিনি একাই থাকতেন। ওই হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে বেশ কয়েকজনকে আটকের খবর এর আগে গণমসাধ্যমে এলেও পুলিশের পক্ষ থেকে কখনো বিষয়টি স্বীকার করা হয়নি।

হত্যাকাণ্ডের দিন সন্ধ্যায় গুলি শব্দের পর তিনজনকে অস্ত্র হাতে পালিয়ে যেতে দেখেছেন বলে একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছিলেন। পুলিশের সরবরাহ করা সিসিটিভির ছবি প্রকাশ করে গত ২১ অক্টোবর বিভিন্ন সংবাদপত্রের খবরে বলা হয়, ওই ছবিতে থাকা তিনজনকে পুলিশ তাভেল্লার হত্যাকারী সন্দেহে খুঁজছে। এরপর সোমবার সকালে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মুনিরুল ইসলাম ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে চারজনকে গ্রেপ্তারের খবর দেন। তিনি জানান, রোববার এই অভিযানে তাভেল্লা হত্যায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটিও জব্দ করা হয়। পরে ঢাকার মহানগর পুলিশ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন।

তিনি জানান, পুলিশ গুলশান থেকে ‘চাকতি’ রাসেল, বাড্ডার সাতারকুল এলাকা থেকে ‘ভাগ্নে’ রাসেল এবং মধ্যবাড্ডা থেকে রুবেলকে গ্রেপ্তার করে। আর ‘ভাগ্নে’ রাসেলের দেওয়া তথ্যে মধ্যবাড্ডার একটি বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় মোটরসাইকেলের মালিক শরীফকে। আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, “একজন কথিত বড় ভাইয়ের পরিকল্পনায় তারা ইতালীয় নাগরিককে টাকার বিনিময়ে হত্যা করে। তাদের টার্গেট ছিল সাদা চামড়ার একজন নাগরিক। তাভেল্লাকে তারা আগে থেকে চিনত না। ওই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই তাভেল্লাকে হত্যা করা হয়।”

কত টাকায় তারা চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল জানতে চাইলে পুলিশ কমিশনার বলেন, গ্রেপ্তাররা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে একেক জন একেক রকম অংক বলেছে। তারা বলছে, অর্ধেক টাকা আগে দেওয়া হলেও হত্যাকাণ্ডের পর তাদের বাকি টাকা দেওয়া হয়নি। ঘটনার বিবরণ দিয়ে তিনি বলেন, “রাসেল চৌধুরী ওইদিন বিকেলের পর থেকে গুলশানের ৯০ নম্বর সড়কে অবস্থান নেয়। পরে ভাগ্নে রাসেল ও রুবেল মোটরসাইকেল নিয়ে তাভেল্লাকে অনুসরণ করে পেছন থেকে গলি করে ৮৩ নম্বর সড়ক দিয়ে পালিয়ে যায়।”

সকালে শরীফের কাছ থেকে মোটরসাইকেল ধার নিয়ে রাতে আবার তা ফেরত দেওয়া হয় বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, “তারা নেশায় আসক্ত, বিভিন্ন মামলায় তারা কারাভোগ করেছে। রুবেল ওরফে শুটার রুবেল ঠাণ্ডা মাথার খুনি। আর শরীফ ইয়াবা ও অস্ত্র বিক্রির সঙ্গে জড়িত বলে আমরা তথ্য পেয়েছি।” তিনি বলেন, পুলিশ ওই কথিত বড়ভাইকে খুঁজছে এবং হত্যার ঘটনায় ব্যবহার হওয়া অস্ত্রটি উদ্ধারের চেষ্টা করছে।

পুলিশ রাসেল চৌধুরীকে আগেই গ্রেপ্তার করেছে বলে পরিবারের অভিযোগের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, “হত্যার ঘটনায় জড়িয়ে থাকার পর তারা পলাতক থাকতে পারে, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিতে পারে, গোপন আস্তানায় পালিয়ে থাকতে পারে। তবে পুলিশ রোববারই তাদের গ্রেপ্তার করেছে।”

গ্রেপ্তারদের মধ্যে দুই রাসেল ও শরীফকে সোমবারই আদালতে হাজির করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আট দিনের রিমান্ডে পেয়েছে পুলিশ। আর রুবেল ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে পুলিশের অপরাধ তথ্য ও প্রসিকিউশন বিভাগের সহকারী কমিশনার মিরাশ উদ্দিন জানিয়েছেন।

Print
396 মোট পাঠক সংখ্যা 1 আজকের পাঠক সংখ্যা

About Jessore Express

Close