হত্যাকাণ্ডের সময় ঘাতকদের যোগাযোগ ছিল ভাইবারে

যশোর এক্সপ্রেস ডেস্ক: ভাইবারের মাধ্যমে লালমাটিয়া ও শাহবাগে প্রকাশকদের ওপর হামলার মিশন সমন্বয় করে খুনিরা। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দুটি অপারেশনেই তিনজন করে অংশ নেয় খুনিরা। সঠিক সংখ্যা জানা না গেলেও তাদের সহায়তায় আশপাশে আরও সহযোগী থাকতে পারে। হামলার পর খুনিদের সর্বশেষ অবস্থান দেখা যায় রাজধানীর যাত্রাবাড়ী ও ওয়ারিতে।

শনিবার দুপুরে রাজধানীর শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটে জাগৃতি প্রকাশনীর কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে এর মালিক ফয়সল আরেফিন দীপনকে হত্যা ও লালমাটিয়ায় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান শুদ্ধস্বরের কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে মালিক আহমেদুর রশিদ টুটুল, ব্লগার রণদীপম বসু এবং কবি ও ব্লগার তারেক রহিমসহ তিনজনের ওপর হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। এর প্রায় ছয় ঘণ্টা পর গণমাধ্যমকে ইমেইল ও টুইট করে দুটি ঘটনার দায় স্বীকার করে আনসার আল ইসলাম নামের একটি জঙ্গি সংগঠন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তদন্তে সংশ্লিষ্ট একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, খুনিদের গতিবিধি এরইমধ্যে নজরদারিতে নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে। খুনি চক্র খুবই ধূর্ত প্রকৃতির। কখনও তাদের অবস্থান শনাক্ত করা যায় আবার কখনও তাদের অবস্থান অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। সর্বশেষ তাদের অবস্থান ঢাকার দুটি স্থানে দেখা গেলেও এরপর তাদের সেসব ভাইবার নম্বর বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। তারা এখনও ঢাকায় অবস্থান করছে নাকি ঢাকা ছেড়েছে সেটা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ওই দুটি অবস্থান থেকে তারা চট্টগ্রাম ও সিলেটের পথে চলে যেতে পারে বলেও ধারণা গোয়েন্দাদের।

ভাইবার বিশ্লেষণ করে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা জানতে পারেন, খুনিরা কেউই ঢাকায় অবস্থান করে না। ঘটনার এক সপ্তাহ আগে তারা ঢাকায় আসে। এরপর শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেট ও জাগৃতি প্রকাশনীর কার্যালয় এবং লালমাটিয়ার সি ব্লকের ৮/১৩-এ নম্বর বাড়ি ও শুদ্ধস্বরের কার্যালয় এবং আশপাশের এলাকাগুলো পর্যবেক্ষণ করে। শেষে নিরাপদে পালিয়ে যাওয়ার সব ব্যবস্থা করেই তারা অপারেশনে নামে।

এসব বিষয়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের (আইসিটি) সাইবার নিরাপত্তা প্রকল্পের ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা তানভীর হাসান জোহা জানান, শনিবারের দুটি হামলার পর আনসার আল ইসলামের নামে দায় স্বীকার করে ফেসবুক ও টুইটারে যে তিনটি বার্তা আপলোড করা হয়েছিল সেটা ঘটনার প্রায় ছয় ঘণ্টার ব্যবধানে করা হয়েছে। লালমাটিয়ার বিষয়ে টুইট করা হয় বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে। শাহবাগে আজিজ সুপার মার্কেটের হামলার বিষয়ে দায় স্বীকারের বার্তাটি আপলোড করে এর এক ঘণ্টা পর সাড়ে ৬টার দিকে।

জোহা আরও জানান, অবস্থান অস্পষ্ট রাখতে খুনিরা ইন্টারনেটে বার্তা আপলোড করার ক্ষেত্রে এবার কিছুটা চালাকির আশ্রয় নিয়েছিল। বাহ্যিকভাবে দেখলে মনে হবে বার্তাগুলো সিরিয়া থেকে আপলোড করা হয়েছে। সেজন্য তারা ভার্চুয়াল প্রটোকল নেটওয়ার্ক (ভিপিএন) সফটওয়্যার ব্যবহার করে। বাস্তবে তারা ঢাকার দুটি স্থান থেকেই এ বার্তাগুলো আপলোড করে। আগে ঘটনার ১০ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যেই দায় স্বীকার করে বার্তা আপলোড করেছিল। এবারই এক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্নতা দেখা যায়।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ জোহা বলেন, খুনিদের বেশ কিছু ভাইবার নম্বর শনাক্ত করে তদন্তে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থাকে দিয়েছেন তারা। লালমাটিয়া ও শাহবাগে হামলার পর আইএস, আল কায়েদা ও আনসার আল ইসলামের নামে তিনটি বার্তা আপলোড করা হয়। আশুরায় পুরান ঢাকায় হোসনি দালানে বোমা হামলা, বিভিন্ন সময় ব্লগার ও লেখকদের হত্যার পর যেসব জঙ্গি সংগঠন দায় স্বীকার করেছিল সবই একই চক্রের কাজ। গোয়েন্দা ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের বিভ্রান্ত করতে তারা বিভিন্ন নামে ও বিভিন্ন সফটওয়্যার ব্যবহার করে চালাকির আশ্রয় নেয়।

জোহা বলেন, চতুর অপরাধীরা এখন শুধু আগ্নেয়াস্ত্র, চাপাতি ও ছোরা নিয়ে বসে নেই। ঘটনা ঘটানোর ক্ষেত্রে এগুলো তারা ব্যবহার করলেও আগে-পরে তারা প্রযুক্তির ব্যবহার করে নিজেদের আড়াল করার চেষ্টা করে। এজন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে প্রযুক্তিতে দক্ষ লোকদের নিয়োগ করতে হবে।

তথ্য ও প্রযুক্তি বিভাগের ফোকাল পয়েন্টের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, অপরাধীরা উন্নত প্রযুক্তির ডিজিটাল সিকিউরিটি প্রসেসিংয়েও অনেক দূর এগিয়ে গেছে বলে তথ্য রয়েছে তাদের কাছে। যে প্রযুক্তি দিয়ে সিম বেইজ বোমা হামলা চালাতে পারবে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো। ওই পদ্ধতিতে সন্ত্রাসীরা টার্গেট করা স্থানে মোবাইলে কল দেওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বোমা বিস্ফোরিত হবে।

দেশে সন্ত্রাসী হামলার আরও তথ্য রয়েছে জানিয়ে তানভীর হাসান জোহা বলেন, কোথায় কোথায় বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা নিয়েছে সন্ত্রাসীরা, সেসব বিষয়গুলো তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোকে অবহিত করেছেন। গেল দুর্গা পূজায় কক্সবাজার ও বান্দরবানে বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা ছিল সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তারা আগাম বার্তা দিয়েছেন বলেই তারা সেটা ঠেকাতে পেরেছেন। হামলা চালাতে ব্যর্থ হয়েছে সন্ত্রাসীরা।

শাহবাগ ও লালমাটিয়ায় হামলার ঘটনা প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশের জনসংযোগ শাখার উপ-কমিশনার মুনতাসিরুল ইসলাম বলেন, জাগৃতির প্রকাশক দীপন হত্যা ও শুদ্ধস্বরে হামলার ঘটনা তদন্তে আগের অভিজ্ঞতাগুলো কাজে লাগাতে চায় পুলিশ। রহস্য উদঘাটনে প্রযুক্তির পাশাপাশি সনাতন পদ্ধতিতেও বিশ্বস্ত অনুচর নিয়োগ করে তদন্তের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, তদন্ত এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। পারিপার্শ্বিক আলামতে মনে হচ্ছে এগুলো আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের কাজ।

Print
840 মোট পাঠক সংখ্যা 1 আজকের পাঠক সংখ্যা

About Jessore Express

Close