ডিজিটাল বাংলাদেশের পথে

আইটি ডেস্ক:  ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন আর কেবল স্বপ্ন নয়, তথ্যপ্রযুক্তির বাহনে চড়ে দুরন্ত গতিতে দেশজুড়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে ডিজিটাল সেবা। দুর্গম প্রান্তিক এলাকার পিছিয়ে পড়া জনসাধারণ থেকে শুরু করে শহুরে জীবনেও লেগেছে ডিজিটাল স্পর্শ। ফলে ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন যাপিত জীবনকে বদলে দেওয়া এক সফল অভিযাত্রার নাম। ডিজিটাল এই কর্মযজ্ঞে চলতি বছর বাংলাদেশ নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে উত্তীর্ণ হয়েছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের সফল গল্পটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও উদাহরণ হিসেবে টানা হচ্ছে। গত জুলাই মাসে কেনিয়া সফরে ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচির প্রশংসা করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। বাংলাদেশে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সাফল্য তুলে ধরে বক্তব্য দিয়েছেন বিশ্বসেরা সফটওয়্যার কোম্পানি মাইক্রোসফট প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস। ইন্টারনেট ডট ওআরজি কর্মসূচির আওতায় বিনামূল্যে ইন্টারনেট সেবা চালু করায় নিজের স্ট্যাটাসে বাংলাদেশকে তুলে ধরেছেন ফেসবুকের কর্ণধার মার্ক জাকারবার্গ।

২০০৯ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে শুরু হয় ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার কার্যক্রম। ‘জনগণের দোরগোড়ায় ডিজিটাল সেবা’ স্লোগানে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্যে ‘ভিশন-২০২১’ ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী। দেশে চালু হয় থ্রিজি। দ্রুত বাড়তে থাকে সেলফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারকারী। মোবাইল ফোন গ্রাহক ইতিমধ্যে ১৩ কোটির মাইলফলক ছাড়িয়েছে। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীও ইতিমধ্যে পাঁচ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। ইন্টারনেট ব্যবহার সাশ্রয়ী করতে দফায় দফায় ব্যান্ডউইথের দাম কমিয়েছে সরকার। ২০০৪ সালে যে ১ এমবিপিএস ব্যান্ডউইথের দাম ছিল ৭২ হাজার টাকা, তা এখন ৬২৫ টাকায় নেমে এসেছে! প্রাথমিকভাবে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের গ্রাহকরা এই দামে ব্যান্ডউইথ পাচ্ছেন। যদিও প্রতি এমবিপিএস ৬২৫ টাকার মধ্যে শুভঙ্করের ফাঁকি রয়েছে। তবুও ক্রমান্বয়ে ইন্টারনেটের দাম গ্রাহকের ক্রয়সীমার মধ্যে নিয়ে আসার এই প্রচেষ্টার সুফল মিলতে শুরু করেছে। এখন সেলফোনের মতো ইন্টারনেট ব্যবহারকারীও বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে সরকার। ইউনিয়ন পর্যায়ে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সুবিধা পেঁৗছে দিতে আইসিটি ডিভিশন বাংলা গভনেট এবং ইনফো সরকার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। চলতি বছর বাংলা গভনেট প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে। এতে করে উপজেলা পর্যায়ে ইন্টারনেট পৌঁছানোর পথটি সুগম হয়েছে। ২০১০ সালে চালুর পর মোবাইল ব্যাংকিংয়ে নীরব বিপ্লব সংঘটিত হতে চলেছে। দেশে বর্তমানে প্রায় তিন কোটি নিবন্ধিত মোবাইল ব্যাংকিং গ্রাহক রয়েছেন। প্রতিদিন গড়ে ৪৩২ কোটি টাকা এ খাতে লেনদেন হচ্ছে। সেলফোনের মাধ্যমে অর্থ লেনদেনে সত্যিকার অর্থেই মোবাইল ব্যাংকিং যুগান্তকারী ভূমিকা রাখছে। আর এই মোবাইল ব্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের সাফল্যের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন বিল গেটস।

সফটওয়্যার ও আইটিএস খাতে সাফল্য:
দেশের সফটওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবায় এক ধরনের নীরব বিপ্লব সংঘটিত হতে চলেছে। অমিয় সম্ভাবনাময় এই খাতটির বিকাশে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। এ খাতটিকে এগিয়ে নিতে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ সফটওয়্যার খাত থেকে ২০১৮ সাল নাগাদ এক বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। একই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে দেশের সফটওয়্যার খাতের সবচেয়ে বড় সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড সার্ভিসেস [বেসিস]। গত অর্থবছরে আইটি এবং আইটিএস খাত থেকে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার রফতানি আয় হয়েছে। এখন আগামী তিন বছরের মধ্যে এ খাতে আরও ৬০০ মিলিয়ন ডলার আয় বৃদ্ধি করতে হবে। লক্ষ্য বাস্তবায়নে দক্ষ জনবল তৈরিতে বেশকিছু কর্মসূচি ও প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ। এর মধ্যে লিভারেজিং আইসিটি ফর গ্রোথ অ্যান্ড ইমপ্লয়মেন্ট [এলআইসিটি], লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং প্রকল্প, জাতীয় মোবাইল অ্যাপস ডেভেলপ কর্মসূচি, নারীদের জন্য বাড়ি বসে বড়লোক কর্মসূচি, ফ্রিল্যান্সারদের সফল উদ্যোক্তা রূপান্তরে ‘ফ্রিল্যান্সার টু এন্টারপ্রেনার’ কর্মসূচি উল্লেখ করা যেতে পারে। দেশের তরুণ মেধাবী শিক্ষার্থীরা মাইক্রোসফট, গুগল, ফেসবুকের মতো বিশ্বসেরা প্রযুক্তি কোম্পানিতে আকর্ষণীয় বেতনের চাকরি পাচ্ছেন। শুধু বুয়েটের শিক্ষার্থীরা নন_ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি নর্থ সাউথ ও আমেরিকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরাও এসব প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগ পাচ্ছেন। তবে দক্ষ জনবল তৈরির পাশাপাশি দেশেই তাদের জন্য কাজের সুযোগ তৈরিতে উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমেও তরুণ উদ্যোক্তা ডেভেলপাররা সফটওয়্যারভিত্তিক সেবা বিপণন করে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অর্থ আয় করছে। অঙ্কের হিসাবে আউটসোর্সিং খাত থেকেও আয়ের পরিমাণ বেশ ঈর্ষণীয় বলা যায়। তবে সুনির্দিষ্ট ডাটা না থাকায় সঠিক আয়ের পরিমাণ উল্লেখ করা যাচ্ছে না। আর একটি সুখবর হচ্ছে, ইতিমধ্যে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ আসতে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালির শীর্ষস্থানীয় বিনিয়োগকারী কোম্পানি ফেনক্স ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বাংলাদেশে ২০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে। এ ছাড়া সুইজারল্যান্ডের ইনভেস্টমেন্ট এবি কিনেভিক, নরওয়ের এসএনটি ক্লাসিফায়েডস, রকেট ইন্টারনেট, সিকসহ বিশ্বের বিভিন্ন নামিদামি কোম্পানি ও বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করছে। এ ছাড়া স্থানীয় বড় বড় গ্রুপ অব কোম্পানি দেশের আইসিটি খাতে বিনিয়োগ করবে। তবে সহজে বহির্বিশ্বের উদ্যোক্তারা যেন আমাদের এখানে বিনিয়োগ করতে পারে এজন্য ভেঞ্চার ক্যাপিটাল পলিসি তৈরি জরুরি। সরকার বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। সংশ্লিষ্টরা প্রত্যাশা করছেন, দ্রুত নীতিমালাটি প্রণীত হবে। আর সেটি হলে হাজার কোটি ডলারের সফটওয়্যার বাজারে আমাদের সম্মানজনক অবস্থান সহজেই তৈরি হবে।

সফটওয়্যার ও আইটি পার্ক :
দীর্ঘদিন ধরে সফটওয়্যার ও আইটি পার্ক তৈরির নানা ঘোষণাা পর প্রথমবারের মতো এ বছর রাজধঅনীর জনতা টাওয়ারে প্রথম সফটওয়্যার পার্ক তৈরির কার্যক্রম শুরু হয়েছে। যশোর সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কের কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে চলছে। গাজীপুরের কালিয়াকৈর হাইটেক পার্কেও কয়েকটি ব্লক ইতিমধ্যে লিজ দেওয়া হয়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান অ্যাক্সেঞ্চার ও অগমেডিক্সসহ চারটি প্রতিষ্ঠানকে সফটওয়্যার পার্ক ঘোষণা করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি:
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ সম্পর্কে তুলে ধরতে বড় ভূমিকা রেখেছে নানা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। গত ২৬ মে আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়নের [আইটিইউ] সদর দপ্তর জেনেভায় এ পুরস্কার গ্রহণ করেন এটুআই প্রতিনিধিরা। এ বিভাগে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জার্মানি, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, কুয়েত, ইতালিসহ বিশ্বের ৪৬টি দেশের উদ্ভাবনী প্রকল্প মনোনীত হয়। সব উদ্ভাবনকে ছাড়িয়ে শীর্ষ উদ্ভাবনের স্বীকৃতি পায় আমাদের ‘জাতীয় তথ্য বাতায়ন’।

Print
329 মোট পাঠক সংখ্যা 1 আজকের পাঠক সংখ্যা

About admin

Close