বিক্রি হতে যাচ্ছে খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলের মেশিনারিজ!

যশোর এক্সপ্রেস ডেস্ক: অবশেষে ঐতিহ্যবাহী খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলের মেশিনারিজ ও যন্ত্রাংশ স্ক্রাপ হিসেবেই বিক্রি হতে যাচ্ছে। মোট জমির অর্ধেকেরও বেশি বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে দিয়ে বাকি জমিতে নতুন পেপার মিল স্থাপনের উদ্যোগের নামে এমনটি হচ্ছে। আবার বর্তমান সরকারের একাধিক পরিকল্পনার সফল কোনো বাস্তবায়ন সহসাই যে খুলনাবাসী দেখছে না সেটিও অনেকটা নিশ্চিত। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন-বিসিআইসির সূত্রটি জানায়, খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিল চালুর জন্য ইতোপূর্বের পরিকল্পনা ও প্রস্তাবনা বাদ দিয়ে সর্বশেষ সেখানে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও নতুন একটি পেপার মিল স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য মিলের ৫০ একর জমি পিডিবিকে দেয়ার প্রক্রিয়াও প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। বাকি ৩৭ একর জমিতে স্থাপন করা হবে আধুনিক পেপার মিল। যেখানে নিউজপ্রিন্ট নয়, তৈরি হবে সাদা ও অফসেট কাগজ। এজন্য বিসিআইসির একটি টিম মিল এলাকা পরিদর্শন করে সাড়ে ৮শ’ কোটি টাকার একটি প্রস্তাবনা দিয়েছে। যেটি বিসিআইসি থেকে শিল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তাবটি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে যাওয়ার কথা। মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মামুনুর রসুল জানান, সাড়ে ৮শ’ কোটি টাকার নতুন পেপার মিল স্থাপনের প্রস্তাবটি বিগত দু’মাস আগে বিসিআইসিতে পাঠানো হয়। বিসিআইসি থেকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এপ্রস্তাবনা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে যাবার কথা বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

স্থানীয় একটি সূত্র জানায়, বর্তমানে মিলের আবাসিক এলাকায় এলিট ফোর্স র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ান-র‌্যাব-৬ এর সদর দপ্তর না থাকায় পুরো মিল এলাকা অনেকটা অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। মিলের সম্পদ রক্ষায় সেখানে বর্তমানে ৩১জন আনসার সদস্য নিয়োজিত রয়েছে বলেও মিলের ব্যাবস্থাপক (প্রশাসন) নুরুল্লাহ বাহার জানান। তিনি বলেন, ‘ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ অফিসিয়াল কার্যক্রম দেখার জন্য তিনজন কর্মকর্তা নিয়োজিত রয়েছেন।’নিউজপ্রিন্ট মিল রক্ষা কমিটির আহবায়ক নিজাম-উর-রহমান লালু বলেন, ‘২০০৮ সালের নির্বাচনে বন্ধ মিল চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসার পর দ্বিতীয় মেয়াদে দেশ পরিচালনা করলেও ঐতিহ্যবাহী এ মিলটি চালু না হওয়ায় খুলনার শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে। তবে এখনও খুলনার মানুষ আশায় বুক বেঁধে আছে যে, সরকার যেভাবে মংলা বন্দরকে গতিশীল ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় উন্নয়ন অব্যাহত রেখেছে তার ধারবাহিকতায় নিউজপ্রিন্ট মিলটিও চালু করবে। খুলনার পিপলস ও দৌলতপুরের ন্যায় এ মিলটিও সহসা চালু হবে এমন আশাবাদও খুলনাবাসীর।

এদিকে, পিপলস জুট মিলকে খালিশপুর জুট মিল হিসেবে চালু করতে এসে ২০১১ সালের ৫ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিউজপ্রিন্টসহ সকল বন্ধ মিল চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তার সফরের সাড়ে তিন বছর পর অর্থাৎ ২০১৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু খুলনা এসে বলেছিলেন, ‘কর্তৃপক্ষ যে প্রস্তাব দিয়েছে তা’ পর্যবেক্ষণ করে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার পরই পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে’। ওই সময় নিউজপ্রিন্ট মিলটি চালুর জন্য ৮৫৫ কোটি টাকার একটি প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল বিসিআইসির পক্ষ থেকে। এখন সে প্রস্তাব থেকে সরে গিয়ে নতুন প্রস্তাব অর্থাৎ বিদ্যুৎকেন্দ্র ও নতুন পেপার মিল স্থাপন প্রক্রিয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সরকার।অপরদিকে, বার বার প্রস্তাব দেয়া ও সে প্রস্তাবনা পরিবর্তন করার পরিকল্পনাকে অনেকে ভিন্ন চোখে দেখছেন। এমন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রকল্পগুলোকে মাটিচাপা দেয়ার শামিল বলেও অনেকে মনে করছেন। উদাহরণ টেনে অনেকে বলেন, খুলনা টেক্সটাইল মিল এলাকায় টেক্সটাইল পল্লী স্থাপন, খুলনা বিদ্যুৎ কেন্দ্রস্থলে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন আর দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরি চালুর বিষয়টি ঝুলে রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে।

এ প্রসঙ্গে বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ-উজ-জামান বলেন, ‘বার বার পরিকল্পনা পরিবর্তন করার নামে এক শ্রেণির আমলা খুলনার উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করছেন।’ এটিকে প্রধানমন্ত্রীর নিজেরই নজর দেয়া উচিত বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, ‘যেহেতু নিউজপ্রিন্ট মিল চালুর বিষয়টি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীরই প্রতিশ্রুতি, সেহেতু তাকেই এটি শক্ত হাতে দেখা উচিত।’
উন্নয়ন কমিটির মহাসচিব ও টেক্সটাইল মিল রক্ষা কমিটির আহবায়ক আলহাজ শেখ মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘টেক্সটাইল পল্লী স্থাপনের জন্য মিল এলাকার গাছপালা ও মেশিনারিজ বিক্রি করে সাড়ে ৫শ’ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হলেও প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীর গতি দেখে খুলনাবাসীর মধ্যে হতাশা দেখা দিচ্ছে।’তিনি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে দ্রুত টেক্সটাইল পল্লী বাস্তবায়নের দাবি জানান। একইসঙ্গে নিউজ প্রিন্ট মিলকেও যেন টেক্সটাইলের ভাগ্য বরণ করতে না হয় সেটিও দেখার আহবান জানান তিনি।

প্রসঙ্গত, নগরীর শহর খালিশপুরে ভৈরবের তীরে ৮৭ দশমিক ৬৯৫ একর জমির ওপর ১৯৫৯ সালে স্থাপন হয় খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলটি। কানাডার মেসার্স স্যান্ডওয়েল অ্যান্ড কোম্পানির মাধ্যমে ইপিআইডিসি মিলটি প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৫৯ সালে পরীক্ষামূলক ও বাণিজ্যিক উৎপাদনের পর ১৯৮১ সালে শুরু করে ১৯৮৫ সালে বিএমআরই সম্পন্ন করে। এর পর ১৯৯৮-৯৯ ও ১৯৯৯-২০০০ সালে মিলটির সর্ট বিএমআরই করা হয়। কিন্তু লোকসানের অজুহাত দেখিয়ে ২০০২ সালের ৩০ নভেম্বর মিলটি বন্ধ করা হয়। এরপর থেকেই খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলটি পরিণত হয় নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির কেন্দ্রবিন্দুতে। যখনই জাতীয় নির্বাচন হয় তখনই এটি চালুর প্রতিশ্রুতি দেয় রাজনৈতিক দলগুলো। আবার বিএনপি-জামায়াত জোট এটি বন্ধ করে বলেও বিষোদগার করে বিপরীত মেরুর রাজনৈতিক নেতারা। কিন্তু ক্ষমতার মেয়াদ বাড়লেও ভাগ্য বদলায় না নিউজপ্রিন্ট মিলের। পক্ষান্তরে বন্ধ হয় চালু থাকা ঐতিহ্যবাহী অপর শিল্প প্রতিষ্ঠান দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরি।

Print
845 মোট পাঠক সংখ্যা 3 আজকের পাঠক সংখ্যা

About admin

Close