‘খাওয়া হয় না ঠিকমতো, আমাগির আবার ঈদ’

এক্সপ্রেস ডেস্ক: সখিনা বেগমের বয়স প্রায় ৯০। বয়সের ভারে ন্যুয। শ্রবণ প্রতিবন্ধী এই বৃদ্ধা কবে ঈদ ছিল তাও জানেন না। দুই ছেলে ও এক মেয়ে থাকলেও তারা তার দেখাশুনা করেন না। দেখবেই কী করে, তাদেরই তো ঠিকমতো দিন চলে না! ছোট ছেলে মাঝে মাঝে খোঁজ-খবর নেয়। ভিক্ষা করে জীবন চলে সখিনা বেগমের। তিনি একজন বাঘ-বিধবা। তার স্বামী শহর আলী মোল্লাকে বাঘে নিয়ে গেছে অনেক বছর আগে। এখনও সংগ্রাম করে কোনোমতে টিকে আছেন তিনি। শুধু তিনিই নন, বর্তমানে সাতক্ষীরার সুন্দরবন উপকূলীয় এলাকায় প্রায় এক হাজার একশ ৫০ জন বাঘ-বিধবা রয়েছেন। সব বাঘ-বিধবা নারীর গল্প প্রায় একই। কথা হচ্ছিল, সুন্দরবনের কোলঘেঁষা মুন্সিগঞ্জ এলাকার শাহিদা বেগমের (৪০) সঙ্গে। তিনি তার স্বামীকে বাঘে ধরার বর্ণনা দিলেন এভাবে, ‘ঘরে কোনও চাল ছেল (ছিল) না। মহাজনের কাছ থেকে টাকা দাদন নিয়ে সোমবার বাদায় (বন) গেল। মঙ্গল ও বুধবার বাদায় থাকার পর বৃহস্পতিবার শুনলাম, তারে বাঘে ধুরিছে (ধরেছে)’, বলতে বলতে চোখ ছলছল করে ওঠে শাহিদার। বেশ কয়েক বছর আগে তার স্বামী রহমান মোড়ল সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে মারা যান। তারপরও নানা অপবাদের বোঝা মাথায় নিয়ে নদীতে জাল টেনে আর অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে সংসার চালান তিনি। ঈদে কিছুই কিনতে পারেননি তিনি।এ বছর সরকারিভাবে ১০ কেজি চাল পেয়েছেন মাত্র। ঈদের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, খাবা (খাওয়া) হয় না ঠিকমতো। আমাগির আবার ঈদ!

বাঘ-বিধবা শাহিদা বেগমএভাবেই প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি সুন্দরবনের কোলে বসবাসরত বাঘ-বিধবা পরিবারগুলোর ঈদ আনন্দ ম্লান হয়ে গেছে। তাদের জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ, জঙ্গলে ডাকাত।

সম্প্রতি, বনদস্যু ও জলদস্যুদের অত্যাচারে অসহায় হয়ে পড়েছেন বনজীবীরা। এতে করে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল প্রায় ২৫ লাখ মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। সরকারের কাছ থেকে বৈধভাবে অনুমতি নিয়ে অনেকে সুন্দরবনে ঢুকলেও বনদস্যুরা জিম্মি করে মুক্তিপণ দাবি করছে। মুক্তিপণের টাকা পরিশোধ করতে না পারলে দিতে হচ্ছে জীবনও। আবার সুন্দরবনের সম্পদ আহরণ করতে গিয়ে অনেকে বাঘ ও কুমিরের কবলে পড়ছেন।
প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ সরকারের কাছ থেকে পাস নিয়ে সুন্দরবনে যান। এ সময় বাঘ ও কুমিরের আক্রমণে অনেকেই মারা পড়েন। এতে করে এ সব পরিবারের সদস্যরা অসহায় হয়ে পড়েন।
২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত চালানো বেসরকারি এক জরিপে জানা যায়, স্বাধীনতার পর থেকে হাজার খানেক বনজীবী জঙ্গলে গিয়ে বাঘ, কুমির ও সাপের আক্রমণে জীবন দিয়েছেন। তবে বর্তমানে প্রায় এক হাজার একশ ৫০ জন বাঘ-বিধবা বেঁচে আছেন। স্বামীহারা নারীরা অনেক সময় সামাজিক কুসংস্কারের কারণে একঘরে কিংবা ‘অপয়া’ অপবাদ নিয়ে স্বামীর ভিটা থেকে বিতাড়িত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করেন। শুধু তাইই নয়, তাদের সন্তানরাও নানা কুসংস্কারের জালে জড়িয়ে লেখাপড়া ও সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন।

সুন্দরবনের সীমানায় বসবাসরত বাঘ-বিধবাদের এসব সমস্যা সমাধানে কাজ করছে, বেসরকারি সংস্থা অনির্বাণ, দুর্জয় জাগ্রত বাঘবিধবা নারী সংঠগন ও লির্ডাস। লির্ডাসের কর্মকর্তা পিযুষ বাউয়ালি পিন্টু জানান, সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরায় ইউনিয়নে ২৮৫ জন, বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নে ৮১, মুন্সিগঞ্জে ১৪৩ জনসহ সুন্দরবনের কোলে প্রায় এক হাজার একশ ৫০ জন বাঘ-বিধবা রয়েছেন।

বাঘের থাবায় আহত বনজীবীতিনি বলেন, সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০০৯ সালেই সুন্দরবনে গিয়ে মারা যান ১২০ জন জনজীবী। তবে স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, এ সংখ্যা আরও বেশি। কেননা, যারা অবৈধভাবে সুন্দরবনে গিয়ে মারা যান, তাদের নাম সরকারি খাতায় ওঠে না।

পিযুষ বাউয়ালি জানান, বাঘ বা কুমিরের আক্রমণে স্বামী নিহত হলে তার দায় স্ত্রীর ওপর চাপিয়ে ‘অপয়া’, ‘অলক্ষ্মী’ অপবাদ দিয়ে তাদের ভিটেছাড়া করা হয়।
তিনি আরও জানান, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী টাকা জমা দিয়ে বৈধভাবে পাস নিয়ে বনে যেতে অনেকেই মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নেন। জঙ্গলে গিয়ে দস্যুদের হাতে অপহৃত হলে মুক্তিপণ দিয়ে মুক্ত হতে আরেক দফা ঋণগ্রস্ত হন তারা। বন থেকে খালিহাতে ফিরে আসার পর আরেক দফা হাত পাততে হয় মহাজনদের কাছে। এভাবে ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েন বনজীবীরা।
এদিকে, সম্প্রতি সুন্দরবনে ডাকাতদের উপদ্রব আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় বনজীবীরা মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন।
মুন্সিগঞ্জ এলাকার বাসিন্দারা জানান, সুন্দরবনের ত্রাস মাস্টার বাহিনী ৩১ মে র‌্যাবের কাছে আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু থেমে নেই অত্যাচার। মনজু বাহিনী, আয়ুব বাহিনী, জোনাব বাহিনী, আলম বাহিনী এরকম প্রায় ডজনখানেক বাহিনী রয়েছে সুন্দরবনে।  জঙ্গলে জেলে-বাওয়াল ও মৌয়ালরা ঢুকলেই কোনও না কোনও বাহিনী তাদের অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি করে। ফলে, তারা ঋণের জালে জড়িয়ে হাবুডুবু খেতে  বাধ্য হন।

Print
672 মোট পাঠক সংখ্যা 1 আজকের পাঠক সংখ্যা

About Jessore Express

Close