যাত্রাশিল্পের সেকাল-একাল : যাত্রার অনবদ্য দলিল

এক্সপ্রেস ডেস্ক: যাত্রাশিল্পী মিলন কান্তি দে। বয়স ৬৮। তার দেওয়া তথ্যানুযায়ী, প্রায় ৬ দশক ধরে তিনি আছেন যাত্রামঞ্চে। অভিনয়, পালা রচনা, নির্দেশনা ও সাংগঠনিক চর্চা করে এক সময় তার মনে হয়েছে যাত্রা নিয়ে লেখা উচিত। সে অনুযায়ী লেখালেখি শুরু করেন এবং আজ অবধি নিরলসভাবে তিনি লিখে চলেছেন। তার লেখা শুধুই যাত্রাকে ঘিরে। বিগত চার দশকে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক ও ত্রৈমাসিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে তার অর্ধশতাধিক লেখা। তা থেকে উল্লেখযোগ্য লেখা নিয়ে তিনি ইত্যাদি প্রকাশনী থেকে ‘যাত্রাশিল্পের সেকাল-একাল’ নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। এটিই তার প্রকাশিত প্রথম গ্রন্থ।

গ্রন্থটি আপাতদৃষ্টিতে দেখলে মনে হতে পারে, এই একটিমাত্র গ্রন্থে হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী যাত্রাশিল্পকে কতটুকুইবা তুলে ধরা সম্ভব? কতটুকুইবা তুলে ধরতে পেরেছেন? কিন্তু প্রসারিত মনোভাব নিয়ে বইটি পাঠ করলে বোঝা যাবে কত গুরুত্বপূর্ণ সে বই! কত ব্যাকুলতা সে লেখায়।

সাহিত্যমূল্য বিচারে একজন সাহিত্য সমালোচক প্রতিটি লেখাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারেন, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। এর কারণ প্রতিটি লেখাতেই সংবেদনশীলতার অভাব আছে, ক্ষোভ আছে, আছে কাঠামোবদ্ধ প্রবন্ধ কিংবা নিবন্ধ রচনার অদক্ষতা ও পরিমিতিবোধের অভাব। তথাপি ইতিহাসমূল্য বিচারে এর গুরুত্ব বহুমাত্রিক।

অবশ্য, সমালোচকের সঙ্গে বাহাস (তর্ক) করার মতো উপকরণও হয়তো আছে মিলন কান্তি দের কাছে। কারণ, তিনি যাত্রার মানুষ। যাত্রার সংকট, সম্ভাবনা, যাত্রানুরাগী ও পথিকৃৎ মানুষদের তিনি যেভাবে কাছে থেকে দেখেছেন একজন সমালোচকের পক্ষে সেভাবে দেখা সম্ভব নয়। হয়নিও। ফলে, সেই অদেখা সম্ভাবনা ও দেখা পরিহাস পরিস্থিতি তাকে সংবেদনশীল হতে সহায়তা করেনি। যাত্রা নিয়ে তার দীর্ঘ সংগ্রাম আলোর মুখ দেখেনি বলে সে যাতনা তার তীব্র। এই তীব্র যাতনার সঙ্গে বাস করে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে পথ চলা, লেখালেখি করা দূরহ কাজ। তবুও তিনি লিখছেন। কারণ, তিনি জানেন, মিলন কান্তি দে ও এমএ মজিদ ছাড়া নিয়মিত যাত্রা নিয়ে লেখার মানুষ কোথায়?

আমার কাছে মনে হয়েছে, মিলন কান্তি দে প্রবন্ধ-নিবন্ধ এসব কিছু লিখতে চাননি। তিনি যাত্রার সমকালীন পরিস্থিতি তুলে ধরতে চেষ্টা করেছেন। আর সেটিই এক ধরনের মন্তব্য প্রতিবেদন হিসেবে প্রকাশ পেয়েছে।

ইতিহাস চর্চার অন্যতম আশ্রয় ও বিশ্বাসের উপকরণ পত্রিকার মন্তব্য প্রতিবেদন। সেখানে ইতিহাসের রূপরেখা বিশ্বস্ততার সাথে পাঠকের কাছে ধরা দেয়। সে বিবেচনায় ‘যাত্রা শিল্পের সেকাল-একাল’ গ্রন্থে বিগত চার দশকের চিত্র তো আছেই, প্রাসঙ্গিকক্রমে আছে যাত্রাশিল্পের গৌরবোজ্জল ইতিহাস।

সে কারণেই হয়তো বইটির ভূমিকায় নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার লিখেছেন, ‘মিলন কান্তি দের গ্রন্থটি শিক্ষার্থী, যাত্রানুরাগী, পাঠক, গবেষক ও সর্বোপরি যাত্রা সম্পর্কে আগ্রহী সকলের কাছে আদরণীয় হবে বলে আমি মনে করি।’

৬টি অংশে তিনি লেখাগুলি সাজিয়েছেন-প্রথম অংশের নাম ‘সংকট-সমস্যা’ দ্বিতীয়টি ‘ইতিহাস-ঐতিহ্য-মুক্তিযুদ্ধ’ তৃতীয় ‘সচেতনতা’ চতুর্থ ‘যাত্রানুরাগী-সংস্কৃতিজন’ পঞ্চম ‘পথিকৃৎ’ ও সর্বশেষ অধ্যায়টির নাম ‘পরিশিষ্ট’।

সংকট সমস্যা অংশে তিনি যাত্রার সংকট ও সমস্যার সুনির্দিষ্ট কারণ তুলে ধরেছেন। ইতিহাস-ঐতিহ্য-মুক্তিযুদ্ধ অংশে ফুটে উঠেছে আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে কীভাবে যাত্রা যুক্ত আছে একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে যাত্রাশিল্প ও যাত্রাশিল্পীর ভূমিকাও স্পষ্ট হয়েছে। সচেতনতা শিরোনামের লেখায় পরিবেশ সচেতনতা ও আর্থ সামাজিক উন্নয়নে যাত্রাপালার ভূমিকা তিনি তুলে ধরেছেন। যাত্রানুরাগী-সংস্কৃতিজন অংশে যাত্রাশিল্পে নির্মল সেন, কামাল লোহানী, শামসুর রাহমান, রামেন্দু মজুমদার, মামুনুর রশীদ, আহমদ জামান চৌধুরী, জিয়া হায়দার, সেলিম আল দীন, মমতাজউদদীন আহমদ, আতাউর রহমান, আজিজ মিসির, এসএম মহসীন ও লিয়াকত আলী লাকীর ইতিবাচক ভূমিকার কথা তুলে ধরেছেন।

পথিকৃৎ শিরোনামের লেখায় ব্রজেন্দ্র কুমার দে, অমলেন্দু বিশ্বাস, তুষার দাশগুপ্ত, মুকুন্দ দাশ, নগেন নন্দী, শ্যামাচরণ, গজেন দত্ত, নয়ন মিয়া, অনিল ঘোষ, এমএ হামিদ, চিত্ত পাল, বিমল পাল, নকুল কর্মকার, সাদেক আলী, প্রতাপাদিত্য দত্ত, মঞ্জুশ্রী মুখার্জী, জাহানারা বেগম, জ্যোৎস্না বিশ্বাস, শবরী দাশগুপ্ত, আরশাদ আলী, মাস্টার সেকান্দার আলী, মায়া চক্রবর্তী, মুকুন্দ ঘোষ, স্বপন কুমার প্রমুখ যাত্রাব্যক্তিত্বের জীবন ও কর্ম বিষয়ক বর্ণনা আছে।

পরিশিষ্ট অংশে তিনি যাত্রা বিষয়ক অনেক অজানা বিষয়ের সন্ধান দিয়েছেন। অনেক অজানা মানুষের ছবিও তিনি সংযুক্ত করেছেন।
শুরুতেই বলা হয়েছে এটি যাত্রাশিল্পের ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থ নয়, তবুও লেখকের অভিজ্ঞতা ভিত্তিক লেখা ও প্রকাশকের আন্তরিক উপস্থাপনে গ্রন্থটি যাত্রাশিল্পের অনন্য দলিল হয়ে থাকবে।

বইটি উৎসর্গ করেছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরীকে। যিনি উপদেষ্টা থাকাকালীন যাত্রা নিয়ে ভেবেছিলেন। ২৮০ পৃষ্ঠার বইটির বিক্রয় মূল্য ৪০০ টাকা, প্রচ্ছদ শিল্পী ধ্রুব এষ। প্রকাশ করেছে ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ।

Print
649 মোট পাঠক সংখ্যা 1 আজকের পাঠক সংখ্যা

About Jessore Express

Close