যশোর কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে আহত ‘বন্দি’রা শেষতক চিকিৎসা পেল

এক্সপ্রেস ডেস্ক: যশোর কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে ‘বন্দি’দের মধ্যে সংঘর্ষে আহত পাঁচজনকে তিনদিন পর বুধবার দুপুরে চিকিৎসার জন্য জেনারেল হাসপাতাল আনা হয়। এদের মধ্যে দুইজনের আঘাত গুরুতর হওয়ায় চিকিৎসক তাদের হাসপাতালে ভর্তি থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। বাকিদের হাসপাতাল থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে সংশোধন কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
তিন দিন আগে এই পাঁচজন মারপিটের শিকার হলেও কর্তৃপক্ষ তা চেপে যাওয়ার মানসে তাদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করেনি। কেন্দ্রের সাইকো সোশ্যাল কাউন্সিলরও তা স্বীকার করেছেন।
হাসপাতালে ভর্তি আহতরা হলো, যশোর শহরের চাঁচড়া রায়পাড়া এলাকার নুরুল হকের ছেলে হৃদয় আহম্মেদ (১৪) ও একই এলাকার বাবু সরদারের ছেলে লাভলু সরদার (১৫)। হাসপাতাল থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে যাদের উন্নয়ন কেন্দ্রে ফেরত পাঠানো হয়েছে, তারা হলো, শহরের চাঁচড়া রায়পাড়া এলাকার খোকন কাজীর ছেলে অন্তর (১৪), একই এলাকার জিয়াউর রহমানের ছেলে নয়ন (১৬) এবং আব্দার ম-লের ছেলে হাবিল (১৬)। এরা সবাই রেলগেট এলাকার জিম হত্যা মামলার আসামি। আদালতের নির্দেশে এদের কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে রাখা হয়।
আহত হাবিলের মা শিরিনাসহ অন্য অভিভাবকদের অভিযোগ, কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সামনে ‘বন্দি’ পাঁচজনকে বেত ও ক্রিকেট খেলার উইকেট দিয়ে মারপিট করা হলেও তারা কোনো ব্যবস্থা নেননি। অবস্থা খারাপ দেখেও কর্মকর্তারা আহত পাঁচজনকে চিকিৎসার ব্যবস্থা না করে কেন্দ্রের অভ্যন্তরে আটকে রাখেন। বিষয়টি আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতে অভিযোগ করলে বুধবার সকালে তাদের হাসপাতালে আনা হয়।
হাসপাতালে কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের সাইকো সোশ্যাল কাউন্সিলর মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘জানাজানি হওয়ার ভয়ে ও চাকরিতে সমস্যা হতে পারে আশঙ্কায় এডি সাহেবের নির্দেশে আহতদের ঘটনার দিন হাসপাতালে আনা হয়নি। পরে অভিভাবকরা ডিসিকে অবগত করলে আহতদের চিকিৎসার উদ্যোগ নেন এডি। তাই পুলিশের সহযোগিতায় আহতদের হাসপাতালে আনা হয়েছে।’
যদিও ঘটনার ব্যাপারে জানতে চাইলে কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের সহকারী পরিচালক মো. শাহাবুদ্দিন মঙ্গলবার বলেছিলেন, মারপিটের ঘটনা তিনি জানতেন না। খবর পেয়ে দু’দিন পর তিনি উন্নয়ন কেন্দ্রে আসেন বলে দাবি করেন।
আহতরা অভিযোগ করে, কেন্দ্রের মধ্যে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা ভিসা, রকি (১), রকি (২), শাওন হাবিবসহ ১৩-১৪ জনের একটি গ্রুপ গড়ে উঠেছে। তারা কেন্দ্রের মধ্যে ‘বড় ভাই’ বলে পরিচিত। সালাম না দেওয়ার ‘অপরাধে’ তারা গত ১০ জুলাই হল রুমের মধ্যে নিয়ে পিটিয়ে জখম করে পাঁচ ‘বন্দি’কে। বিষয়টি কর্তৃপক্ষ জানলেও আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেনি। ঘটনার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
আহতরা অভিযোগ করেন, ‘বড় ভাই’ গ্রুপের সদস্যরা প্রায় সময় কেন্দ্র থেকে বাইরে আসা-যাওয়া করে। বিষয়টি কর্তৃপক্ষ জেনেও কোনো ব্যবস্থা নেয় না।
আহত ‘বন্দি’ হৃদয় দাবি করে, সংরক্ষিত এলাকা হলেও কিশোর সংশোধন কেন্দ্রের অভ্যন্তরে যৌন উত্তেজক ট্যাবলেট, গাঁজা, ইয়াবাসহ নানা ধরনের নেশাজাতীয় দ্রব্য পাওয়া যায় সহজেই। কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় এসব অবৈধ দ্রব্য কেন্দ্রে ঢোকানো হয়।
সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন কেন্দ্রের অভ্যন্তরে নেশাজাতীয় দ্রব্যের সহজলভ্যতার অভিযোগ কবুল করেন। তবে তিনি দাবি করেন, কিশোরদের আদালতে আনা হলে সেখানকার হাজতখানা থেকে তারা নেশাদ্রব্য সংগ্রহ করে গোপনে কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে নিয়ে যায়।
প্রসঙ্গত, দেশের দুটি কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের একটি যশোর শহরতলীর পুলেরহাটে অবস্থিত। এই কেন্দ্রে নানা দুর্নীতি, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনার কারণে প্রায়ই অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। ‘বন্দি’ পালানোর ঘটনাও আকছার। বড় ধরনের এক অপ্রীতিকর ঘটনার পর জেলা প্রশাসন গঠিত তদন্ত কমিটি ২০১৪ সালের ২১ মে তৎকালীন জেলা প্রশাসকের কাছে দাখিল করা তদন্ত প্রতিবেদনে বলেছিলেন, ‘এই কেন্দ্রটি দুর্নীতির আখড়া। সরকারি নীতির ছিটেফোঁটাও বাস্তবায়িত হয় না এখানে।’
যশোরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ সোহেল হাসানের নেতৃত্বাধীন ওই তদন্ত কমিটি সে সময় কেন্দ্রটির পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে বেশ কয়েকটি সুপারিশ করেছিল। কিন্তু সে সব সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হয়নি। এমনকী ‘অথর্ব কর্মকর্তা’ হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন আজো কেন্দ্রটির প্রধান (সহকারী পরিচালক) পদে বহাল রয়েছেন।

Print
656 মোট পাঠক সংখ্যা 3 আজকের পাঠক সংখ্যা

About Jessore Express

Close