ওই দূর সমুদ্রসীমায়

যশোর এক্সপ্রেস ডেস্ক: শিহাব শাহরিয়ার : শুনে শুনে মাথার মধ্যে একটা নেশা জেগে উঠছিল, কবে আসলে মাহাথির মোহাম্মদের গড়া পূর্ব এশিয়ার আধুনিক ও উন্নত দেশটি দেখতে যাব। উৎসাহটা আরো বাড়িয়েছেন আমার ভাইরাভাই ফররুখ আহমদ। দারুণ একজন ভ্রমণপিয়াসী মানুষ। আর আমার স্ত্রীর অভিমান ও উৎসাহ তো আছেই। ও (স্ত্রী) একদিন বলেই ফেলল, ‘তুমি একা একা আমেরিকা, বিলেত ঘুরছো আমাকে অন্তত ভারত, নেপাল অথবা মালয়েশিয়ায় ঘুরিয়ে আনো’ তার এই অভিমানকে গ্রাহ্য করেই মালয়েশিয়া যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। ফারুক ভাই নেট ঘেটে ঘেটে মালয়েশিয়ার পুরো পর্যটন অঞ্চলগুলো তটস্থ করে ফেললেন। দিনক্ষণ ঠিক করে মালিন্দো এয়ারলাইন্সে সাতজনের ভ্রমণ দল উড়াল দিলাম। দিনটি ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৫। মাত্র সাড়ে তিন ঘণ্টার জার্নি। রুটটা চট্টগ্রাম, রেঙ্গুন, ব্যাংকক তারপর পেনাঙ, লাঙ্গকাওয়ি হয়ে কুয়ালালামপুর। আমরা ঢাকা থেকেই টিকেট করে গিয়েছিলাম।  তাই কুয়ালালামপুর বিমানবন্দরে নেমেই এয়ার এশিয়া এয়ারলাইন্সে এক ঘণ্টার ভ্রমণে সরাসরি চলে গেলাম লাঙ্গকাওয়িতে। বিমানবন্দরে নামার আগেই উপর থেকে তাকিয়েই মনটা ভরে গেল। পাহাড় ও সমুদ্রঘেরা রোদে ঝকঝক করা একটি অঞ্চল দেখে। এখানে বলে রাখি, আমার স্ত্রী প্রথম বিমান ভ্রমণে দারুণ উপভোগ করছে। প্রায় আকাশের কাছাকাছি গিয়ে মেঘের দলে দলে ওড়ে যাওয়া আমাকে যেমনটা নাড়িয়েছিল, তাকেও তেমনি নাড়াচ্ছে পাশে বসে সেটি দারুণভাবে টের পাচ্ছি। ছোট্ট একটি বিমানবন্দর। আমরা বিমান থেকে নেমে ইমিগ্রেশন শেষ করে হোটেলের উদ্দেশ্যে মাইক্রোতে উঠলাম। গাড়ি চলছে আর আমাদের মনের চোখও চলছে। দারুণ সুন্দর করে গড়ে তুলেছেন মাহাথির তার মাতৃভূমিকে। মনে হলো, ইউরোপ-আমেরিকারই মতো নান্দনিক। মিনিট বিশেকের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম আমাদের পূর্ব নির্ধারিত বেস্ট স্টার হোটেলে। আন্দামান সাগরের পাড়ে নাতিদীর্ঘ অথচ অসম্ভব সুন্দর একটি সৈকতের পাশেই আমাদের হোটেলটি। হোটেলে উঠার সঙ্গে সঙ্গেই বৃষ্টির কবলে পড়ে গেলাম। টানা বৃষ্টি, আমাদের মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল। কে জানি একজন বলেছিলেন, মালয়েশিয়া চির বসন্তের দেশ। এই রোদ, এই বৃষ্টি, এই খেলা চলে সারা বছরই। বৃষ্টি পড়ছে কিন্তু আমরা হোটেলের লবি থেকেই দেখছি আন্দামান সাগরের অপূর্ব দৃশ্য। বেস্ট স্টার হোটেলের রয়েছে একটি চমৎকার সুইমিং পুল। পুলটির এক পাশে হোটেল অন্য পাশে সাগর। জোয়ারের সময় ঢেউগুলো কখনো কখনো এসে খাবি খায় সুইমিং পুলের শরীরে। লাঙ্গকাওয়ির এই সমুদ্রঘেরা অঞ্চলটির নাম পানতাই চেনাঙ। খুবই পরিচ্ছন্ন, নিরিবিলি আর বিভিন্ন দেশের অসংখ্য পর্যটকে ঠাসা জায়গাটি ভাল লেগে গেল। অনেক বাংলাদেশিকেও দেখতে পেলাম। দুপুরের পর থেকে যে বৃষ্টি, তা আর থামল না। বৃষ্টি মাথায় নিয়েই আমরা একটু দূরে কেএফসিতে খেতে গেলাম। খুবই সু-স্বাদু এবং বলা যায় কিছুটা সস্তায় রাতের খাবার খেলাম। খাওয়া শেষে পরিকল্পনা অনুযায়ী পরের দিনের ম্যানগ্রোব ট্যুর ফাইনাল করে আড্ডা-টাড্ডা মেরে অনেক রাতে ঘুমাতে গেলাম। খুব সকালে উঠে নাস্তা সেরে সকাল ন’টায় রওনা হলাম ম্যানগ্রোব দেখার জন্য। মাইক্রোবাসে প্রায় চল্লিশ মিনিট যাত্রা শেষে আমাদের নামানো হলো একটি সমুদ্র-ঘাটে। এখানে বলে রাখি, এটি একটি প্যাকেজ ট্যুর। প্রতিজন পঁচাশি রিংগিট করে। হোটেল থেকে মাইক্রোবাসে নিয়ে যাবে, তারপর স্পিডবোটে সমুদ্রঘেরা পাহাড়াঞ্চল ঘুরে দেখা এবং দুপুরের খাবার। ঘাটে যেতে যেতে দেখলাম, আন্দামান সাগরের পাশের এই অঞ্চলটিতে জন-বসতি কম, সমুদ্র আর পাহাড়ের পাদদেশে সমভূমির এই দৃশ্য আমি শ্রীলঙ্কাতেও দেখেছি। যাহোক ঘাটে এসে দেখলাম, অসংখ্য স্পিডবোট বাঁধা রয়েছে। একজন গাইড এসে আমাদের একটি বোটে উঠালেন এবং স্বাগত জানালেন। এরপর সবাইকে লাইফ-জ্যাকেট পরতে বলে এই ভ্রমণে জীবনের ঝুঁকি সম্পর্কে বয়ান দিলেন এবং সাবধান ও সচেতন থাকার সুপরামর্শ দিলেন। আমরা মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে সমুদ্র-দর্শন যাত্রা করলাম। পনের মিনিটের এরকম যাত্রা একবারই করেছিলাম কক্সবাজার থেকে মহেশখালি। কিন্তু এটির সঙ্গে ওটি বলা যায় শিশু। কারণ স্পিডবোট যাত্রায় যে ঝুঁকি, তাতে মনে মনে ভয়ই হচ্ছিল। রোমাঞ্চকর তো বটেই। নীল-পরিচ্ছন্ন সমুদ্র জল এর আগে আমি কখনো দেখিনি। ঢেউয়ের প্রতিকূলে স্পিডবোটটি ছুটে চলছে যেন বিদ্যুৎ গতিতে। যাত্রী হিসেবে আমাদের সাতজনের সঙ্গে ছিলেন আরো ছয় বাংলাদেশি, টার্কিশ ও কয়েকজন ইউরোপীয় পর্যটক। কয়েক মিনিট দম বন্ধ করা ছুটে চলার পর একটি পাহাড়ের গায়ে গিয়ে বোটটি থামল। দেখলাম আমাদের বোটের পাশাপাশি আরো কয়েকটি বোট রয়েছে। গাইড আমাদের জানালেন, এই পয়েন্টে মাছের খাবার দেওয়া হয়, আমাদের দেখালেন নানা প্রজাতির অসংখ্য মাছ ভেসে বেড়াচ্ছে। ততক্ষণে আমাদের সবার ভয় কিছুটা কমতে শুরু করেছে। এরপর নিয়ে গেলেন বানর পয়েন্টে, দেখলাম বোট থেকে জলে পাউরুটি ছিটিয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাশের জঙ্গলাশ্রিত পাহাড় থেকে অসংখ্য বানর এসে পাউরুটি খাবার জন্য লাফিয়ে পড়ল জলে। অসাধারণ সে দৃশ্য, বানরগুলো সাঁতার কাটছে আর খাবার খাচ্ছে। পরের জায়গাটি ঈগল পয়েন্ট। এই পয়েন্টটি আমার দারুণ লাগল তিন দিকে উঁচু পাহাড় মাঝখানে শান্তজল আর উপরে উড়ছে অস্যখ্য ঈগল। আবার যাত্রা, দুই দিকে পাহাড় মাঝখান সরু পথে বোট যাচ্ছে। যেতে যেতে আমাদের নেওয়া হলো বাদুড় পয়েন্টে। অন্ধকার গুহা। গুহার গায়ে অসংখ্য বাদুড়। এরপর আমাদের নেওয়া হলো চমৎকার একটি ভাসমান রেস্টুরেন্টে। জায়গাটি খুবই সুন্দর। নিসর্গ আর প্রকৃতির সমন্বয়ে অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমিতে গড়ে তোলা এই ভাসমান রেস্টুরেন্টের কোনায় বসে ঈশ্বরকে আবারো ধন্যবাদ দিলাম। ধন্যবাদ দিলাম, চট্টগ্রামের বংশোভূত মাহাথিরকে। কি দারুণ পরিকল্পনাই তার। দুপুরের খাবার খেলাম এমনই পরিবেশে। এরপর ফিরে এলাম। যেখানে নামলাম সেটি শান্ত নিরিবিলি একটি সৈকত। ফেরার সময় গাইড বলছিলেন সমুদ্রের ওপর পাড়েই থাইল্যান্ড। ওই দূর সমুদ্র সীমায়।

মাইক্রোতে হোটেলে ফিরে সুইমিং-এ যাবো, এ সময় আমার ভ্রমণসঙ্গী দুই আহমেদ ফররুখ আহমেদ ও সেলিম আহমেদ বললেন, চলেন, বীচে গিয়ে প্যারাসেইলিং করে আসি। সে এক অজানা আনন্দ ও রোমাঞ্চকর সমুদ্র এবং আকাশ ভ্রমণ। বিভিন্ন দেশের ভ্রমণপিয়াসীরা এই প্যারাস্যুটে উঠছে, মজা করছে। একটি স্পিডবোট টেনে নিয়ে উড়িয়ে দেয় আকাশে, প্যারাস্যুটের রশি শক্ত করে ধরে রেখে শূণ্যের উপর ভাসতে ভাসতে দারুণ লাগল কয়েকটি মিনিট। যদিও আমাদের কোনো পূর্ব প্রস্তুতি ছিল না। দুই আহমদের সৌজন্যে আমি ও আমার স্ত্রী চমৎকার অনুভূতি নিলাম। জীবনের আনন্দ-ভা-ারে জমা হল আরেক রসদ। এরপর সুমিং করে ফ্রেশ হয়ে খেতে গেলাম মেগডুনালসে। কারণ শুনেছি একটি মাত্র বাঙালি খাবারের দোকান রয়েছে এখানে। তুলনামূলক ফাস্টফুডই ভাল। এখানে একপাশে সমুদ্র অন্যপাশে একটি রাস্তা ধরে বিভিন্ন ধরনের খাবারের দোকান, পোশাকের দোকান, গ্লোসারি, শপিংমল ইত্যাদি রয়েছে। অনেক রাত অব্দি লোকজন থাকে রাস্তায়। যানজট নেই, কোলাহল নেই, ছিনতাই-রাহাজানি নেই, আছে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা। আমরা খাবার শেষে বিচে গেলাম, হাঁটলাম আর বসে বসে ভারত মহাসাগরের পাশের আন্দামান সাগরের ঢেউয়ের গর্জন শুনে শুনে অনেক রাত পর্যন্ত কাটিয়ে দিলাম।

পরের দিন আরেকটি প্যাকেজ ট্যুরে বের হলাম। পানতাই চেনাঙ থেকে বেরিয়ে এয়ারপোর্টকে পাশে রেখে আমরা প্রথমেই ওরিয়েন্টাল ভিলেজে গেলাম। রাস্তায় কোনো যানজট নেই, মুক্ত বিহঙ্গের মতোই যেন ছুটে গেল আমাদের গাড়ি। ওরিয়েন্টাল ভিলেজের মূল আকর্ষণ ক্যাবেলকারে শূণ্যে ভ্রমণ। ভয় এবং রোমাঞ্চ দুটোই ভিতরে আলোড়িত করে। দার্জিলঙে প্রথম ওঠার অভিজ্ঞতায় সাহস করলাম। মিনিটে মিনিটে কারগুলো একের পর এক দূর পাহাড় চূড়া থেকে নামছে, উঠছে। অসংখ্য পর্যটক উপভোগ করছে এই আনন্দখেলা। আয়োজকরা কারে উঠার আগে কয়েক মিনিটের একটি ভিডিও ক্লিপ দেখায়, পুরো ভ্রমণটার ওপর। তারপর লাইনে দাঁড়িয়ে এক এক করে উঠান যাত্রীদের। আমরা সাতজন উঠলাম একটি কারে। শাঁই শাঁই করে খাড়া উঠে যাচ্ছে অনেক উপরে। দুই পর্যায়ে ভ্রমণটি হয়। মূল স্টেশন থেকে কয়েক হাজার ফিট যাবার পর একটি পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে বিরতি দেওয়া হয়। তারপর আবার উঠায়। আমরা যেতে যেতে একদিকে সমুদ্রের জল, অন্যদিকে পাহাড় আর একটি দারণ সুন্দর ঝর্ণা দেখতে পেলাম। দ্বিতীয় যাত্রায় যেখানে গিয়ে থামলাম, সেটি অনেক উপরে। এখানে একটি নান্দনিক আকর্ষণ স্কাইব্রিজ। শূণ্যের উপর ভাসছে ব্রিজটি। শত শত পর্যটক ব্রিজে দাঁড়িয়ে প্রকৃতি দেখছে, ছবি তুলছে এর মধ্যে অনেক বাংলাদেশিও আছে। আমরা কিছুক্ষণ অবলোকন করে, পুনরায় কারে উঠে নেমে এলাম সমতলে। একটি আকর্ষণীয় ভ্রমণ এটি। এখান থেকে বেরিয়ে আমরা প্রায় ঘণ্টা খানেক পথ অতিক্রম করে লাঙ্গকাওয়ির মূল শহর কুয়াতে গেলাম। সেই পরিচ্ছন্ন সড়ক বেয়ে এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অবলোকন করে কুয়ার সমুদ্রঘেরা জেটির কাছে গেলাম। এখানে সবচেয়ে দর্শনীয় হল ঈগল পয়েন্ট। সমুদ্রজলের পাশে বিশাল একটি ঈগল ভাস্কর্য তৈরি করে পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় স্থান করে গড়ে তুলেছে মালয়েশিয়া সরকার, তা ভাবতেই হবে। তখন দুপুর গড়াচ্ছে। আমরা ঈগল পয়েন্ট থেকে পুনরায় পানতাই চেনাঙের দিকে যাত্রা করলাম। পথে দেখলাম পাহাড় থেকে নেমে আসা চমৎকার ঝর্ণা। বিকেল নাগাদ ফিরে খাওয়া-দাওয়া সেরে ঘুরে বেড়ালাম পানতাই চেনাঙের পথে পথে এবং সন্ধ্যায় আন্দামান সাগরে একটি অসাধারণ সূর্যাস্ত দেখার স্মরণীয় সময় কাটালাম। রাত অব্দি থাকলাম সৈকতে, মনটা ভরে গেল এই সমুদ্রের অতল স্পর্শে।

পরদিন এ জীবনে দেখা অসাধারণ একটি জায়গা লাঙ্গকাওয়ি ছেড়ে বিমানে উড়াল দিলাম কুয়ালালামপুরের উদ্দেশ্যে। এসে উঠলাম কেএল সেন্টারের পাশেই সামারভিউ হোটেলে। বলা যেতে পারে কেএল সেন্টারটিই কেন্দ্রবিন্দু। এখান থেকে যাতায়াত করা খুবই সহজ ও সুন্দর। আমরা প্রথমেই গেলাম এ শহরের দর্শনীয় টুইনটাওয়ার দেখতে। ব্যক্তিগতভাবে আমি বিশ্বের বাণিজ্যিক রাজধানী বলে খ্যাত নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটানে অবস্থিত টুইনটাওয়ারও দেখে এসেছি। কিন্তু মালয়েশিয়ার টুইনটাওয়ারটি দেখে আমার অন্যরকম ভাল লাগল। দারুণ সুন্দর অবকাঠামোর একটি বিল্ডিং যা স্টিলনেস স্টিল দিয়ে কারুকাজময় করে গড়ে তোলা হয়েছে। এটির উচ্চতা এক হাজার চার শত তিরাশি ফুট। এর সামনে একটি অসাধারণ ফোয়ারা রয়েছে, যাতে মিউজিক ও লাইটিয়ের তালে তালে যখন ফোয়ারার জলের সুইস টিপা হয় সে এক অসাধারণ দৃশ্য। হাজার হাজার পর্যটক রাত-দিন উপভোগ করছেন টুইনটাওয়ারের সৌন্দর্য। পাশেই রয়েছে নিসর্গশোভিত একটি পার্ক। অনেক রাত পর্যন্ত দর্শকরা মনোরেল অথবা মেট্রো অথবা লাক্সারিয়াস বাসে করে এখানে আসছে আর ঘুরে বেড়াচ্ছে। এখান থেকে পর্যটকদের জন্য বিনা ভাড়ায় পিংক বাসে উঠে চায়না টাউনে এলাম। এখানে মাইডিন শপিং মলটিতে ঢুকে কিছু কেনাকাটা করলাম। এ সময় দেখতে পেলাম অনেক বাংলাদেশি ছাত্র-ছাত্রীকে, যারা পার্ট-টাইম কাজ করছে। হাঁটতে হাঁটতে পাসারসানিতে এসে সন্ধ্যা-উত্তীর্ণ রাতে মনোরেলে করে চলে এলাম কেএল টাওয়ারে। এখানে একটি হোটেলে ঢুকলাম রাতের খাবার খেতে। পাওয়া গেল কয়েকজন বাংলাদেশি যুবককে। তারা এগিয়ে এলো আমাদের খাবার পরিবেশন করার জন্য। আমরা ভাত, মাছ-ভাজি, মাংস, কাচা মরিচ, পিয়াজসহ খুব আয়েশ করে খেয়ে ফিরে এলাম হোটেলে। অনেক রাত পর্যন্ত আড্ডা দিয়ে ঘুমাতে গেলাম।

এখানে বলে রাখি, হোটেল আমাদেরকে প্রতিদিন সকালের নাস্তা দিয়েছে। অসাধারণ সেই খাবারের মেন্যু। পরদিন নাস্তা করে বেরিয়ে গেলাম মালয়েশিয়ার প্রশাসনিক শহর পুত্রজায়ার উদ্দেশ্যে। কেএল সেন্টার থেকে মেট্রোতে উঠে চল্লিশ মিনিটের পথ। ট্রেনে তেমন ভিড় নেই। সকালের মিষ্টি রোদে ভালই লাগল। পুত্রজায়া স্টেশনে নেমে, সেখান থেকে একটি মাইক্রো ভাড়া করে যখনই সড়ক পথে উঠলাম, সভ্যতার এক নান্দনিক শহরে প্রবেশ করলাম যেন। প্রিয় মাহথির মুহম্মদ আপনাকে আবারো অভিনন্দন। কিছু দূর যাওয়ার পর পেলাম পুত্রজায়া ব্রিজ, যার নাম সেরি ওয়াওয়াসান ব্রিজ। দেখতে দারুণ। সেখান থেকে কিছু দূর যাওয়ার পর দেখতে পেলাম দুটি স্থাপত্য। একটি মসজিদ ও অন্যটি প্রধানমন্ত্রীর অফিসভবন। অপূর্ব, এটি সত্যি অবাক করার মতো। এই দুটি ভবন দেখতে প্রতিদিন শত শত দর্শক সমাগম হচ্ছে। খোলামেলা ও ফুলের বাগান, লেক আর কারুকাজময় ভবন। তখন দুপুরের ভ্যাপসা গরম গায়ে মেখে কিছু সময় পর আবার যাত্রা করলাম সানওয়ের উদ্দেশ্যে। সানওয়ে একটি পরিপূর্ণ উপশহর, যেখানে আছে পাঁচ তারকা হোটেল, বিশ্ববিদ্যালয়, শপিং মল, সানওয়ে লেগুন, ওয়াটার ওয়ার্ল্ডসহ পর্যটকদের জন্য নানা আয়োজন। এই স্বয়ং সম্পূর্ণ প্যাকেজ শহরটি পরিকল্পিতভাবে তৈরি করেছে সানওয়ে গ্রুপ। আমরা ঘুরে ঘুরে দেখে সন্ধ্যায় ফিরে সরাসরি চলে গেলাম কেএল টাওয়ারে। এক হাজার তিন শত উনআশি ফুট উচ্চতার এই ওয়াচিং টাওয়ারটি পর্যটকদের জন্য আরেকটি আকর্ষণীয় বিষয়। আমরা টিকিট কেটে টাওয়ারে উঠলাম। এই টাওয়ারটির পৃথিবীর একটি সেরা স্থাপনা। উপর থেকে দেখলাম সন্ধ্যার ঘন অন্ধকারে কুয়ালালামপুর জ্বলছে নিয়ন আলোয়। আমরা খুবই ভাগ্যবান যে, সেদিন ছিল ইন্টারন্যাশনাল বেস জাম্প সপ্তাহ ২০১৫। প্রতি বছরই নির্দিষ্ট তিন দিন চলে এই ইন্টারন্যাশনাল বেস জাম্প। স্বচক্ষে দেখতে পেলাম সেই গা ছমছম করা অপূর্ব রোমাঞ্চকর দৃশ্য। একের পর এক টপাটপ প্যারাসুটে নামছে জাম্পাররা। আমরা শুধু কল্পনা করতে পারবো, বাস্তবে এই কাজ করা সম্ভব নয়। এক বিরল দৃশ্য দেখে অনেক রাতে ফিরে এলাম হোটেলে।

পরদিন কেএল সেন্টার থেকে ট্যাক্সি ভাড়া করে চলে গেলাম গেনটিং হাইল্যান্ডে। প্রায় এক ঘণ্টার পথ। ওই একই কথা সড়ক পথে যানজট নেই, ফ্লাইওভার, কোথাও কোথাও ছয় লেন। গাড়ি গাড়ির গতিতেই চলল। সেখানে যাবার আগে ট্যাক্সিওয়ালা গাড়ি থামাল একটি দোকানে, যেখানে এদেশের নিজস্ব কারখানায় তৈরি চকলেট বিক্রি করা হয়। দেখলাম একদমই অন্যরকম। যারা গিয়েছেন বা যারা বিভিন্ন সূত্রে জানেন যে, গ্যানটিং হাইল্যান্ডও একটি রোমাঞ্চকর জায়গা। সেখানে যাওয়া যায় দু’ভাবে। এক, সড়ক পথে প্রায় চার ঘণ্টা দুর্গম পাহাড়ি পথ অতিক্রম করে। দুই, ক্যাবলকারে। আমরা ক্যাবেলকারেই উঠলাম। প্রায় ছয় হাজার ফিট উপরে উঠতে হবে। মিনিটে মিনিটে কারগুলো উঠা নামা করছে। ভয়ের বিষয় তো আছেই। উঠার পর বোঝা গেল এই ভয় আর রোমাঞ্চ। প্রায় পঁয়ত্রিশ মিনিট বসে থাকতেই হবে, কারণ এর কোনো বিকল্প নেই। যাবার সময় শুধু উপরের দিকেই উঠছি, দু’দিকে কুয়াশাময় পাহাড়, নানা প্রজাতির বৃক্ষ। বলা যায়, ভয়ে ভয়েই গিয়ে নামলাম গ্যান্টিক চূড়ায়। এমন চূড়ায় এমন শহর হতে পারে, না দেখলে বোঝা যাবে না। আমরা অন্যান্য দর্শনার্থীদের মতো রিসোর্ট ওয়ার্ল্ড ভবনের ভিতরে ঢুকে ধীরে ধীরে নেমে গেলাম থিম পার্কে। সেখানে শিশু কিশোরদের জন্য বিভিন্ন রকমের রাইড, দোকান, একটি ছোট্ট মঞ্চে চলছে ম্যাজিক শো, ভিতরের দিকে রয়েছে বিশাল হল ঘর জুড়ে ক্যাসিনো। সবাই জানেন, এই গ্যান্টিং হাইল্যান্ড বিখ্যাত এই ক্যাসিনোর জন্য। এখানে ঢুকে একটি নতুন অভিজ্ঞতাই হলো। বেশ কিছু সময় পার করে পুনরায় ক্যাবলকারে ফিরে এলাম সমতলে এবং বাসে করে ফিরলাম কুয়ালালামপুর। এখানে বলে রাখি, বিশাল পাহাড়ের উঁচুতে গ্যান্টিং গ্রুপ নির্মাণ করেছে এই গ্যান্টিং হাইল্যান্ড।

ট্যুরিস্টদের জন্য কুয়ালালামপুর শহরে রয়েছে আলাদা ভ্রমণ বাস। পরদিন সকালে টিকেট কেটে আমরা উঠে গেলাম সেই বাসে। এই বাসটি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখায় শহরের দর্শনীয় স্থান ও স্থাপনাগুলো। যেহেতু আমি জাদুঘরে কাজ করি, সেকারণে পৃথিবীর যে দেশেই যাই, ঘুরে দেখি আসি সেদেশের জাতীয় ও অন্যান্য বিষয়ভিত্তিক জাদুঘর। এখানেও তার ব্যতিক্রম হলো না। কারণ একটি জাদুঘরে সংরক্ষণ ও প্রদর্শিত নিদর্শনের মধ্যে লুকায়িত থাকে সেদেশের আদি ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। সুতরাং টিকিট কেটে ঢুকে গেলাম মালয়েশিয়ার জাতীয় জাদুঘরে। বেশ পরিচ্ছন্ন জাদুঘরটির গ্যালারিতে প্রদর্শিত হচ্ছে সেদেশের অসংখ্য নিদর্শন। যাতে ফুটে উঠেছে তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। এরপর আমরা গেলাম বার্ডপার্কে। পাখি আর মানুষের এক সৌহার্দপূর্ণ সহ-অবস্থান এই বার্ডপার্কে না প্রবেশ করলে বোঝা যাবে না। অসংখ্য পর্যটক ঘুরে ঘুরে দেখছেন এই প্রাকৃতিক অঞ্চল। একটি অভয়রাণ্যে কত ধরনের পাখিকে যে স্বাভাবিক পরিবেশে রাখা হয়েছে, তা সত্যি প্রশংসার যোগ্য। এখান থেকে বেরিয়ে পরের বাসে উঠে এক এক করে দেখলাম শহরের নানা স্থাপনা। একটি বিষয় লক্ষ করলাম, শহরে রাস্তাঘাটে তেমন লোকজন নেই। মনে হলো অধিকাংশ লোক চলাচল করে মনোরেল আর মেট্রোতে। সারা দিন শহর ভ্রমণ শেষে রাতে ফিরে এলাম হোটেলে।

১০ দিনের মালয়েশিয়া সফরের শেষ দিনে আমরা নেমে পড়লাম সামান্য কেনাকাটার জন্য। কারণ সন্তান ও আত্মীয়-স্বজনদের জন্য কিছু উপহার দিতেই হয়, এটিও বুঝি বাঙালি আচারের একটি অংশ। সামার্থ্যানুযায়ী কিছু কেনাকাটা করলাম সেই মাইডন শপিং মল থেকে। কেনা হলো, দেখা হলো এবার ফেরার পালা। আবারও বলি পূর্ব এশিয়ার একটি উন্নত দেশের দারুণ সুখকর ভ্রমণ-স্মৃতি নিয়ে মালিন্দো এয়ারলাইন্সে ৫ অক্টোবর ফিরে এলাম নিজের প্রিয় প্রাঙ্গণে।

বিশেষ দ্রষ্টব্য : উন্নত মালয়েশিয়ার মানুষগুলো ভাল, ভাল লাগল মালয়েশিয়ান মিউজিক, রাস্তা-ঘাট, পরিবেশ প্রকৃতি। এই সৌন্দর্যের টানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশ থেকেও প্রতিদিনই যাচ্ছে অসংখ্য মানুষ। শোনা যায়, কেউ কেউ সেখানে সেকেন্ডহোম বানাচ্ছেন। অনেকেই উন্নত চিকিৎসার জন্য যাচ্ছে। কেন যাচ্ছে? আমরা কি মালয়েশিয়ার মতো হতে পারি না?

Print
1070 মোট পাঠক সংখ্যা 1 আজকের পাঠক সংখ্যা

About admin

Close