যশোরে দ্বিতীয়বারের মতো অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে খেজুর গুড় শিল্পমেলা

যশোর এক্সপ্রেস ডেস্ক: শনিবার যশোরে দ্বিতীয়বারের মতো অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে খেজুর গুড় শিল্পমেলা। চারুপীঠ আর্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটে সকাল থেকে চলবে এ মেলা। দিনব্যাপী এ মেলায় থাকছে খেজুর রস, গুড়, পাটালি, গুড়ের পিঠা-পায়েস মিষ্টান্নের প্রদর্শনী ও বিপণন, শিশুদের অংকন প্রতিযোগিতা, আলোকচিত্র প্রদর্শনী, বাউলগান ও আলোচনা অনুষ্ঠান। আবারও আমাদের জীবন নলেনগুড়ের সৌরভে, স্বাদে ভরে উঠুক- এই আকাঙ্ক্ষাকে সামনে রেখে এবার আয়োজন করা হয়েছে মেলাটির।
যশোরের প্রধানতম ঐতিহ্য খেজুর রস, গুড়, পাটালি। যা চিরকাল বাঙালির রসনার অঙ্গ হয়ে পিঠা, পায়েস, মিষ্টান্নে আমাদের কৃষ্টিকে মধুময় করেছে।

একসময় বৃহত্তর যশোরের প্রায় সবখানেই খেজুরগাছের বন ছিল। ব্রিটিশ আমলে খেজুর গুড় থেকে চিনি তৈরির শ’ শ’ কারখানা প্রতিষ্ঠা পায় এবং বিশ্ববাজারে চিনির যোগানদাতা হয় যশোর। আজও সারাদেশের ও বিদেশের খেজুর গুড়ের প্রধান অংশের যোগানদাতার ভূমিকাতেও যশোর। তাই খেজুর রসের পাটালি এখনো যশোরের যশ হিসাবে খ্যাত। যে কারণে যশোর জেলার প্রতীক খেজুরগাছ। খেজুরের রস হতে তৈরি গুড় ও পাটালির স্বাদ ও বৈচিত্র বিষ্ময়কর। গবেষণা ও প্রচেষ্টা থাকলে এই শিল্পের বিশ্বায়ন সম্ভব হতে পারত। পৌষ এলেই সমগ্র যশোরের মাঠ-প্রান্তর-গ্রাম-গঞ্জে খেজুর রসের মৌ মৌ গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। গাছ কাটুনি, রসের হাঁড়ি পোড়ানো, রস জ্বাল দেওয়ার ধুম পড়ে যায়। পিঠা পায়েসের পার্বণ চলতে থাকে ঘরে ঘরে। বাঙ্গালির জীবনে খেজুর গুড়ের চাহিদা কখনোই ম্লান হওয়ার নয়। আজ হঠাৎই শীতের আগমনীতে গাছ ছেলা, হাড়ি পাতা, রস, গুড়-পাটালির গল্প যেন শেষ হতে বসেছে। কয়েক দশক ধরে নির্বিচারে খেজুরগাছ নিধন চলছে ইটের ভাটায় জ্বালানি হয়ে। গাছ কমে গেছে- তাই অনেক গুড়চাষিই পেশা ছেড়েছেন। এখন গাছির অভাবে প্রতিটা অঞ্চলে গাছ ছেলা, রস আহরণ সম্ভব হচ্ছে না। ফলে খেজুর গাছ অপ্রয়োজনীয় ভেবে অবলীলায় গাছ নিধন বেড়ে চলেছে। এদিকে নতুন প্রজন্মের কেউই প্রচলিত পুরনো পদ্ধতিতে এই কঠোর শ্রমের খেজুর গুড় চাষের পেশা গ্রহণ করবে না, এটাই বাস্তবতা। ২০১২ সাল পর্যন্ত যশোরের বাজারে খাঁটি খেজুর গুড় পাওয়া যাচ্ছিল। ২০১৩ থেকেই যশোরের প্রধানতম ঐতিহ্য খাজুরার পাটালিসহ সব ধরনের গুড় পাটালির ঐতিহ্য দ্রুত ধ্বংস হতে চলেছে। চারুপীঠ আয়োজিত প্রথম খেজুর গুড় মেলা ২০১৫ এর সেমিনারে উঠে আসে যুগের পরিবর্তনে আজ গুড়চাষের সকল ব্যবস্থাপনাকে নতুন বাস্তবতার আলোকে পুনর্গঠন ও আধুনিকায়নের অপরিহার্যতা। খেজুর, তাল, পাম-এর জন্য যশোরের মাটিই শ্রেষ্ঠ। এখানে নতুন করে সুপরিকল্পিত উন্নত চাষ ব্যবস্থা গড়ে তোলা যাবে। তাই যশোর কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে খেজুর, তাল, পাম গবেষণা কার্যক্রমে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন বলে প্রস্তাবনা রেখেছেন কৃষিবিজ্ঞানীগণ।
date garden

এই প্রকল্পটি উন্নত প্রজাতি নির্ধারণ করে পরিকল্পিতভাবে বৃক্ষরোপন, গাছের যত্ন, গুড়চাষিদের রস আহরণ ও গুড় তৈরিতে উন্নত প্রশিক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে উন্নত চাষ পদ্ধতি কার্যকর করে তুলবে। নতুন করে কীভাবে খেজুর গাছ রোপণ- করা যায় এটাই সবার একটি প্রধান চিন্তা হওয়া উচিত। হাইওয়ে ও গ্রামের রাস্তার দু’ধার ঘেষে লাখ লাখ খেজুর গাছ রোপন সম্ভব। নদীর পাড়, বাঁওড় ও খালের পাড় সব জায়গাতেই খেজুরবাগান হতে পারে। যশোর ক্যান্টনমেন্ট, বিজিবি ক্যাম্পসহ নানা প্রতিষ্ঠান ও অঙ্গনে পরিকল্পিত খেজুরবাগান করা সম্ভব। যখন পরিকল্পিতভাবে রোপন করা নতুন চারারা বেড়ে উঠবে, ওইভাবে বেড়ে ওঠা লাখ লাখ গাছ লিজ নিয়ে ছোট-বড় ফার্ম হাউজ গড়ে উঠতে পারে। তাদের অনেক ফার্ম আধুনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে রস উৎপাদন করবে, অনেক ফার্ম হবে গুড় তৈরির অত্যাধুনিক ফ্যাক্টরি। এভাবে উন্নতমানের ও ব্যাপক পরিমাণে গুড় উৎপাদন ও বিপণনের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজার প্রতিষ্ঠা পাবে। গুড় শিল্পের নতুন নতুন ব্যবহারের উদ্ভাবন ঘটবে। এটাই আগামীর বাস্তব ছবির সামান্য নমুনা। রাষ্ট্র, প্রশাসন, প্রতিষ্ঠান, সামাজিক উদ্যোক্তাসহ সকল মানুষের আন্তরিকতায় খেজুর রস গুড় শিল্প জাতির জন্য আবারও মূল্যবান শিল্প হিসাবে নব নব সফলতায় প্রতিষ্ঠা পাবে। চারুপীঠ খেজুর গুড় শিল্প মেলা-২০১৬ থেকে যশোরবাসী বাংলাদেশের কৃষির উন্নয়নের সার্থক সফল কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীর কাছে আবেদন করছে যশোরের তথা সারাদেশের খেজুর গুড় শিল্পের ঐতিহ্যের পুনরুদ্ধারে আন্তরিক হওয়ার। একইসঙ্গে তিনি যশোরে কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে খেজুর, তাল, পাম গবেষণা ও প্রসারে কার্যকর প্রকল্প বাস্তবায়নের নির্দেশনা দেবেন- এটাই আকাঙ্ক্ষা। চারুশিল্পের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান চারুপীঠ আর্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট ২০১৫ সাল থেকে যশোরে খেজুর গুড় শিল্প মেলার আয়োজন শুরু করছে। জেলা প্রশাসক জনাব ড. হুমায়ুন কবীর, যশোরের কৃষিবিজ্ঞানী ও কৃষি কর্মকর্তাদের প্রচেষ্টায় প্রথম মেলাটি একটি সেমিনারের রূপ নেয়। যশোর জেলার সবকটি উপজেলা থেকে ৬৫ জন কৃষি কর্মকর্তা ও সকল ক্ষেত্রের মানুষের উপস্থিতিতে এ যাত্রা শুরু হয়েছিল।

Print
2000 মোট পাঠক সংখ্যা 1 আজকের পাঠক সংখ্যা

About admin

Close