বইমেলার হাতছানি, নিরাপত্তা ‘ব্যাপক’ হলেও কাটেনি শঙ্কা

যশোর এক্সপ্রেস ডেস্ক:  হাতছানি দিচ্ছে বাঙালির প্রাণের বইমেলা। প্রস্তুতিও প্রায় শেষ। এখন শুধু উদ্বোধনের আনুষ্ঠানিকতা বাকি। কিন্তু মেলার সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছে লেখক প্রকাশকদের মনে। তবে মেলা কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, নিরাপত্তার কোনো ঘাটতি নেই। লেখক-প্রকাশক-পাঠকদের নিরাপত্তার জন্য সবধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও প্রস্তুত রয়েছে।

গতবছর ২৬ ফেব্রুয়ারি বইমেলা থেকে বের হওয়ার পর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের টিএসসি ফটক সংলগ্ন ফুটপাতে ব্লগার-লেখক অভিজিৎ রায়কে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। একই বছরের ৩১ আগস্ট অভিজিতের বইয়ের প্রকাশক জাগৃতির কর্ণধার ফয়সল আরেফিন দীপনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। একই দিন শুদ্ধস্বর প্রকাশক আহমেদুর রশীদ টুটুলসহ লেখক রণদীপম বসু, কবি তারেক রহিমের ওপর হামলা চালানো হয়।

মেলা যতই সন্নিকটে আসছে, অভিজিৎ রায় হত্যার বিষয়টি ততোই সামনে আসছে। প্রশ্ন উঠছে মেলায় আগতদের নিরাপদে ঘরে ফেরা নিয়ে। ধর্মীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠীরা এই ঘটনাগুলোর সঙ্গে জড়িত বলে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে বলে দাবি করেছে পুলিশ। ফলে এবারের নিরাপত্তা বিষয়ে কিছুটা শঙ্কায় রয়েছেন লেখক-প্রকাশকরা। শ্রাবণ প্রকাশনীর সত্ত্বাধিকারী রবীন আহসান প্রিয়.কম-কে বলেন, ‘বইমেলায় নিরাপত্তার বিষয়ে আমাদের মনে প্রশ্ন থাকা খুব স্বাভাবিক। কারণ গত বছর শাহবাগ থানার তিনশ’ গজ দূরেই হত্যা করা হয়েছে লেখক অভিজিৎ রায়কে। তাহলে পুলিশ দিয়ে কীভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব?’ প্রশ্ন রাখেন এই প্রকাশক।

এবারের বইমেলায় প্রকাশিত নতুন ৩০টি বইয়ের এই প্রকাশক বলেন, ‘আসলে আমরা শঙ্কিত আরও একটি কারণে, তা হলো অভিজিৎ কিংবা দীপনের কোনো হত্যাকারীকে আজ পর্যন্ত সরকার বিচারের মুখোমখি করতে পারেনি। বিচারের মুখোমুখি করলে হয়তো হত্যাকারীরা ভয় পেত। এতে তারা সাবধান হতো। ফলে শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে’।

রবীন আহসান আরও বলেন, ‘নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে প্রশাসনকে অধিক তৎপর হতে হবে। খুনের পরিকল্পনা ধরে ফেলার মতো যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হবে।’ বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান জানিয়েছেন, ‘মেলার প্রবেশ ও বের হওয়ার পথে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা-ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মেলার সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবে বাংলাদেশ পুলিশ, র‌্যাব, আনসার, বিজিবি ও গোয়েন্দা সংস্থারসমূহের নিরাপত্তাকর্মীবৃন্দ। মেলা প্রাঙ্গণ ও পাশ্ববর্তী এলাকায় (সমগ্র মেলা প্রাঙ্গণ ও দোয়েল চত্বর থেকে টিএসসি হয়ে শাহবাগ, মৎস্য ভবন, ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্সটিটিউট হয়ে শাহবাগ পর্যন্ত এবং দোয়েল চত্বর থেকে শহিদ মিনার হয়ে টিএসসি, দোয়েল চত্বর থেকে চাঁনখারপুল, টিএসসি থেকে নীলক্ষেত পর্যন্ত) নিরাপত্তার সার্থে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা থাকবে’।

পুলিশের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে বইমেলায় আগত দর্শনার্থী, লেখক, প্রকাশকসহ দেশের বিশিষ্টজনদের নিরাপত্তা জোরদারের কথা। শনিবার ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার (ডিএমপি) আছাদুজ্জামান মিয়া বলেছেন, ‘এবারের বইমেলায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়ানো হয়েছে। মেলায় অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ডিএমপি থেকে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া করা হয়েছে। বইমেলার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের কয়েকেটি টিম মেলা ও মেলার বাইরে অবস্থান করবে।’

তিনি জানান, নিরাপত্তার আওতায় থাকবে বাংলা একাডেমীর বইমেলা প্রাঙ্গন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-টিএসসি, দোয়েল চত্বর, শাহবাগ, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। এছাড়া বইমেলার প্রতিটি পয়েন্টে থাকবে র‍্যাব-পুলিশের চেকপোস্ট। অমর একুশে বইমেলা ২০১৬’র পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব জালাল আহমেদ প্রিয়.কম-কে বলেন, ‘গত বছরে দায়িত্ব পালনে পুলিশ বাহিনীর কিছু অবহেলা থাকলেও এবার তারা বেশ তৎপর। এবার মেলায় কোনো পুলিশ সদস্য ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারবেন না। ২৫০টি সিসি ক্যামেরায় পুরো মেলা ও আশপাশের এলাকা মনিটর করা হবে।’ তিনি আশা প্রকাশ করেন এবার মেলায় কোনো অপ্রীতিকর কিছু ঘটবে না।

অনুপম প্রকাশনীর মিলন কান্তি নাথ জানান, এবার কর্তৃপক্ষ আরও সতর্ক। প্রকাশকদের সাথে তাদের কথা হয়েছে। তিন স্তরের নিরাপত্তা থাকবে। আধুনিক প্রযুক্তিতে সাজবে মেলাপ্রাঙ্গণ। এবার সিসি ক্যামেরা স্থাপনও কয়েক গুণ বাড়ছে। আশা করছি, অঘটন ঘটবে না। গত ২১ ডিসেম্বর সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর সাংবাদিকদের জানান, ‘এবারের বইমেলায় কোনো ফাঁকিঝুঁকি হবে না, বইমেলায় থাকবে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা। গতবছরের মতো যেন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটে সেজন্য সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকবে প্রশাসন। এ জন্য র‌্যাব, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থাকবে প্রতিটি মুহূর্তে তৎপর।’

মন্ত্রী বলেন, ‘শুধু বইমেলা প্রাঙ্গণই নয়, এর আশপাশের এলাকাও থাকবে সিসি ক্যামেরার নজরদারিতে।’ ১ ফেব্রুয়ারি বেলা তিনটায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবারের বইমেলার উদ্বোধন করবেন। এবছর বইমেলা অনুষ্ঠিত হবে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ এবং একাডেমি সম্মুখস্থ ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। একাডেমি প্রাঙ্গণে ৮২টি প্রতিষ্ঠানকে ১১১টি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৩২০টি প্রতিষ্ঠানকে ৫৪০টি ইউনিট; মোট ৪০২টি প্রতিষ্ঠানকে ৬৫১টি ইউনিট এবং বাংলা একাডেমিসহ ১৪টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে মোট ৬০০০ বর্গফুট আয়তনের ১৫টি প্যাভিলিয়ন বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ২৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছুটির দিন ব্যতীত প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। ছুটির দিন বেলা ১১টা থেকে রাত ৮টা এবং ২১ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত মেলা প্রাঙ্গণ খোলা থাকবে।

Print
1427 মোট পাঠক সংখ্যা 1 আজকের পাঠক সংখ্যা

About admin

Close