ঐশীরা কেন এমন হয়?

জাহাঙ্গীর আলম বকুল : ঐশীর ঘটনা সবাই জানি।এই কিশোরী তার পুলিশ কর্তকর্তা বাবা এবং গৃহিণী মাকে নিজ হাতে হত্যা করে। হত্যা করে ঠান্ডা মাথায় ছোট ভাইকে নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যায় এবং পরে ভীত হয়ে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করে। ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ুয়া, শিক্ষিতা কিশোরীর বাবা-মাকে ঠান্ডা মাথায় হত্যার ঘটনা এই দেশে নজিরবিহীন। এর চেয়ে ভয়াবহ এবং রোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছে নারায়ণগঞ্জে। সেখানে একজন কিশোর হত্যা করেছে আত্মীয় সম্পর্কের দুই শিশুসহ পাঁচজনকে। আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে মাহফুজ ওরফে মোশারফ। মামির সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের নেশায় মত্ত হয়ে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে শিল দিয়ে আঘাত করে একে একে হত্যা করেছে। ঠান্ডা মাথায় হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েও সে স্বাভাবিক ছিল এবং ঘরের দরজা বন্ধ করে চাবি জলাশয়ে ফেলে দিয়ে নিজ অফিসে গেছে।

এই দুটি হত্যাকাণ্ড অত্যন্ত নৃশংস এবং যারা ঘটিয়েছে তারা বয়সে কিশোর (কিংবা সদ্য কৈশোর পেরুনো)। তবে তারা অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় হত্যা সুসম্পন্ন করতে পেরেছে। হত্যাকাণ্ড ঘটনার পরও তারা স্বাভাবিক ছিল। এসব হত্যাকাণ্ড আমাদের অনেক প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। হয়ত এ দুটি ঘটনা দেশে ঘটে যাওয়া বহু ঘটনার প্রতীকী মাত্র। ঐশী ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ুয়া, সুন্দরী এবং রাজধানীর অভিজাত এলাকায় তার যাতায়াত ছিল। বাবা স্বল্প বেতনের পুলিশ কর্মকর্তা হলেও তার চলাফেরা ছিল  সমাজের টাকাওয়ালা ব্যক্তিদের বখে যাওয়া সন্তানদের সঙ্গে। ঐশী তার বাবার কাছ থেকে বড় অংকের টাকা হাত খরচ পেত। দু-একটি মিডিয়ায় সেই অংকটা লেখা হয়েছে লাখ টাকা। আবার হাত খরচ মেটাতে সে নাকি পুরুষের সঙ্গে একান্তে সময় কাটিয়েছে। পত্রিকায় লেখা এসব তথ্য যদি সত্য হয়, তবে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসে, কেন তাকে এত টাকা হাত খরচ দেওয়া হতো। বাবা কি সন্তানস্নেহে অন্ধ ছিলেন? মা কি কখনো জানতে চাননি- এত টাকা নিয়ে মেয়ে কী করে, কোথায় যায়, কাদের সঙ্গে মেশে? নাকি সেই সময় তাদের ছিল না? তারা ব্যস্ত ছিলেন নিজেদের নিয়ে। সন্তানের সঙ্গে তারা কি স্নেহ-ভালোবাসা, মমতার বন্ধন তৈরি করতে পারেননি। মায়া-মমতায় ভরা একটা পরিবারিক আবহে কি ঐশী বড় হয়নি। যদি হয়েই থাকে, তবে সেই বাবা-মা গলায় ছুরি চালানোর সময় কি বাবা-মার করুণ মুখচ্ছবি চোখে ভেসে ওঠেনি?

ঐশী, মাহফুজরা খুনী। তারা নিকৃষ্ট অপরাধ করেছে। কিন্তু সব দায় তাদের কাঁধে চাপিয়ে নিশ্চিন্তে বসে থাকার সুযোগ কিন্তু নেই। অপরাধী আমরাও। এই সমাজে ঐশীরা বড় হয়েছে। আলো-বাতাসে, প্রেম-ভালোবাসা, দ্বন্দ্ব-সংঘাতের মধ্য দিয়ে এই সমাজ তাদের বড় করেছে। দুই কিশোর-কিশোরী খুন করার পর স্বাভাবিক থাকল কীভাবে? পেশাদার খুনীদের পক্ষেও কি সেটা সম্ভব ছিল? আবহমান কাল থেকে গড়ে ওঠা আমাদের সংস্কৃতিতে বড়দের শ্রদ্ধা, ছোটদের স্নেহ, যৌথ পরিবারে মিলেমিশে, ভাবের আদান-প্রদানে বড় হওয়ার শিক্ষা আছে। যৌথ পরিবারে বেড়ে ওঠা ছেলে-মেয়ে শৈশব-কৈশোরে নিঃসঙ্গ থাকে না। সে সহনশীলতা, মানবিক মূল্যবোধ এবং মুরব্বিদের প্রতি শ্রদ্ধা করার শিক্ষা পায়। মুরব্বিদের আদরে-শাসনে ধীরে ধীরে অজানা পৃথিবীকে চেনে। সেই আদর-শাসন কি ঐশী-মাহফুজরা পেয়েছিল। ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ুয়া স্বাধীনচেতা-উচ্ছৃঙ্খল ঐশীর কাছে ‘বাবা ছিল ব্যাকডেটেড (সেকেলে)। আমার সঙ্গে তার ম্যাচ করত না (মিলত না)। আর মা আমার সব কথাই বাবাকে বলে দিত। কোনো ফ্রিডম (স্বাধীনতা) ছিল না। আমি বোর (বিরক্ত) হয়ে গেছিলাম।’ আর বিরক্তি ঘোচাতে বাবা-মাকে হত্যা করে মেয়ে। এই শিক্ষা সে কোথা থেকে পেল।

মাহফুজ মাদকাসক্ত ছিল কি না- তা পত্রিকায় আসেনি। তার চেহারার ছবি দেখে এমন আশঙ্কা করাও ভুল হবে না। কিন্তু ঐশী মাদকাসক্ত ছিল। তার নিয়মিত চলাফেরা ছিল বার, নাইট ক্লাবে। একজন মাদকাসক্ত মানুষের হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। নেশায় বাধা হওয়ায় তারা যেকোনো কাজ করতে পারে। যা করেছে ঐশী। যে কিশোরী মাসে হাজার হাজার টাকা হাত খরচ পেত, ইচ্ছামতো তা ওড়াতে পারত, তার মাদকে অভ্যস্ত হয়ে পড়া অস্বাভাবিক বলা যায় না। পুলিশের একজন ছোট কর্মকর্তা হিসেবে ঐশীর বাবার হাত টানাটানি থাকার কথা ছিল, সেটা দেখতে অভ্যস্ত হওয়ার কথা ছিল ঐশীর। কিন্তু ঐশী জেনেছে- টাকা চাইলেই পাওয়া যায়। টাকার অগাধ প্রাপ্তিই নষ্ট করেছে ঐশীকে।

আধুনিক যুগের ব্যস্ত জীবনের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে যৌথ পরিবার ব্যবস্থা ভেঙে যাচ্ছে। দুর্নীতি হয়েছে সর্বজনীন। পরিবারে নৈতিকতা, সহনশীলতা বিলুপ্ত হচ্ছে। আকাশ সংস্কৃতির প্রভাবে পারিবারিক জীবনে অস্থিরতা বেড়েছে। সেই সঙ্গে পরিবার থেকে বিতাড়িত হচ্ছে ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং অনুশাসন। ফলে জন্ম হচ্ছে ঐশী, মাহফুজদের। মাহফুজ-ঐশীর শাস্তি হবে। হয়ত ফাঁসির রায় কার্যকর হবে। কিন্তু তাতে সমাজের খুব উপকার কিন্তু হবে না। কেন এই রাষ্ট্র-সমাজ মাহফুজ-ঐশীদের জন্ম দিচ্ছে- খুঁজে বের করতে হবে সেটা। এক চিত্রশিল্পী প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষে ঠিক করলেন- তার পেশাগত জীবনের শুরুর ছবিটা সবচেয়ে নিষ্পাপ প্রাণির আঁকবেন। তিনি খুঁজে বের করলেন সদ্য ভূমিষ্ঠ একটি শিশুকে। সেই সবচেয়ে নিষ্পাপ। তিনি তার ছবি আঁকলেন। ওই শিল্পী দীর্ঘ কর্মজীবন পাড়ি দিয়ে শেষ বয়সে পৌঁছালেন। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন- শেষ ছবিটি আঁকবেন পাপিষ্ঠ, কুৎসিত কোনো প্রাণির। তিনি ফাঁসি কার্যকর হতে যাওয়া এক ব্যক্তির ছবি আঁকলেন। ওই নিষ্পাপ শিশু এবং ফাঁসি কার্যকর হতে যাওয়া মানুষটি ছিল একই ব্যক্তি।

Print
1273 মোট পাঠক সংখ্যা 1 আজকের পাঠক সংখ্যা

About admin

Close