বাড়ছে নতুন বই, বাড়ছে ক্রেতা

এক্সপ্রেস ডেস্ক: অমর একুশে গ্রন্থমেলার সপ্তাহ না পেরোলেও এরই মধ্যে জমজমাট মেলার দুই প্রাঙ্গণ। বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দুপুর থেকেই মুখর হয়ে উঠছে মানুষের পদচারণায়। ক্রেতা ও দর্শনার্থীরা স্টল ঘুরে খোঁজছেন তাদের পছন্দের বই। গতবার রাজনৈতিক অস্থিরতায় এ সময় দর্শনার্থীর সংখ্যা হাতেগোনা থাকলেও এবারের চিত্র ভিন্ন। প্রতিদিনই মেলায় বাড়ছে নতুন বইয়ের সংখ্যা আর সেইসঙ্গে বাড়ছে ক্রেতা। সব মিলিয়ে এবারের বইমেলা নিয়ে শুরুতেই সন্তোষ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট সবাই। তবে প্রতিবারের মতো এবারও স্টলবিন্যাস নিয়ে প্রকাশনা মালিকদের অসন্তোষ মেটাতে পারেনি আয়োজক কমিটি বাংলা একাডেমি।

অমর একুশে গ্রন্থমেলার প্রথম দিন ঠিক ক’টি নতুন বই এসেছিল তা জানা না গেলেও দ্বিতীয় দিন বাংলা একাডেমি মাত্র ৭টি নতুন বইয়ের খবর দেয়। এরপর থেকেই বাড়তে থাকে নতুন বইয়ের সংখ্যা। বাংলা একাডেমির তথ্যমতে, তৃতীয় দিন নতুন বই এসেছিল মোট ৬৩টি। চতুর্থ দিন এসেছিল ৯৩টি। পঞ্চম দিন সাপ্তাহিক ছুটির দিনে সেই সংখ্যা এক লাফে বেড়ে ২৫৬টিতে দাঁড়ায়। মেলার ৬ষ্ঠ দিন শনিবার আসে ১৫৫টি নতুন বই। তবে বাংলা একাডেমির তথ্যের বাইরেও আরও নতুন বই মেলায় এসেছে। প্রকাশনা সংস্থাগুলো জানিয়েছে, সব বইয়ের খবর বাংলা একাডেমি পর্যন্ত পৌঁছায় না! গ্রন্থমেলায় গত দিনের মতো শনিবারও ছিল শিশুপ্রহর। সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত শিশু-কিশোর ও তাদের অভিভাবকের পদচারণায় মুখর ছিল বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ। বাংলা একাডেমির তথ্যমতে, মেলায় শনিবার পর্যন্ত বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা ২৮টি নতুন শিশুতোষ বই মেলায় এনেছে। তবে প্রকাশনা সংস্থাগুলো থেকে জানা যায়, এর সংখ্যা পঞ্চাশের বেশি।

শনিবার সকালে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় শিশু-কিশোর সাধারণ জ্ঞান ও উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতার প্রাথমিক বাছাই পর্ব। প্রতিযোগিতায় বিচারক ছিলেন খায়রুল আলম সবুজ, অধ্যাপক মোহাম্মদ সেলিম ও অপরেশ কুমার ব্যানার্জী। শিশু-কিশোর সাধারণ জ্ঞান প্রতিযোগিতায় ১৪৯ জন এবং উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতায় ৬০ জন প্রতিযোগী অংশগ্রহণ করে।  মেলায় প্রচুর দর্শনার্থীর আগমনে সন্তোষ প্রকাশ করেন অনন্যা প্রকাশনীর মনিরুল হক। বলেন, ‘আজ মেলার ৬ষ্ঠ দিন। ছুটির দিন হিসেবে প্রচুর লোক-সমাগম হয়েছে। কিন্তু আরও লোক-সমাগম হওয়ার কথা ছিল। স্টল বিন্যাসের ক্ষেত্রে একটা সমস্যা তীব্র আকার ধারণ করেছে। অনেকেই নিজের পছন্দমতো জায়গায় সামনের দিকে স্টল নিয়ে নিয়েছেন। লটারির ধার ধারেননি। এ ব্যাপারে মেলার আয়োজকদের আগামীতে আরও কঠোর হতে হবে। নইলে আমাদেরকে যে ম্যাপ দেখানো হয়, সেটা মেলা শুরু হওয়ার পর ঠিক থাকে না। এটা ঠিক নয়।’

অন্যপ্রকাশের প্রধান নির্বাহী মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘এবারের মেলার পরিসর নিয়ে সবাই সন্তুষ্ট। প্রকাশকরা মেলার চাহিদা অনুযায়ী বড় জায়গা পেয়েছেন। কিন্তু স্টল বিন্যাস নিয়ে কিছুটা সমস্যা রয়েই গেছে। দোয়েল চত্বর থেকে টিএসসি পর্যন্ত এখনও মেলাকে বারোয়ারি হতে দেয়া হয়নি। এ ধারা যেন মেলার শেষ পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। শুরু থেকেই মেলায় কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকায় দর্শনার্থী এসেছেন কোনো দ্বিধা ছাড়াই।’ শনিবার বিকেলে নালন্দা প্রকাশনীর সামনে এম আর মাহবুব রচিত ও সম্পাদিত ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসভিত্তিক বই ‘ভাষাসংগ্রামের স্মৃতি’ ও ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন’ দুটির মোড়ক উন্মোচন হয়েছে। এতে উপস্থিত ছিলেন ভাষাসংগ্রামী অধ্যাপক ফুলে হোসেন, রওশন আরা বাচ্চু, আবদুল করিম পাঠান, এম এ জলিল, ভাষা মতিনের স্ত্রী গুলবদন নেছা।

অন্বেষা প্রকাশনী থেকে বেরিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মাহবুবুল হক শাকিলের তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘মন খারাপের গাড়ি’। বিকেলে বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে এটির মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে ছিলেন এমিরেটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান, সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার, অধ্যাপক ফকরুল আলম, কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন, কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ও  কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক। নাট্য ও চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঞ্চালনায় আরও ছিলেন অন্বেষা প্রকাশনের সত্বাধিকারী শাহাদাৎ হোসেন। এ সময় আনিসুজ্জামান বলেন, ‘এটা খুব আনন্দের কথা যে প্রতি বছর শাকিলের কবিতার বই বের হচ্ছে। তার কবিতায় আমরা আনন্দের খোরাক পাচ্ছি। তার কবিতার গাড়ি চলতে থাকুক তার যেন কোনো ইস্টিশন না থাকে।’ গোলাম সারওয়ার বলেন, ‘তার কবিতায় প্রকৃতি-প্রেমের অংশটুকু জীবনানন্দের সঙ্গে মিলে যায়। মনে হয় যেন জীবনানন্দ দাশ কথা বলছে।’ অনুভূতি ব্যক্ত করে মাহবুবুল হক শাকিল বলেন, ‘আমি আসলে কবিতা লিখি না। কবিতার মাধ্যমে নিজের সঙ্গে কথা বলি। আমার ব্যক্তিগত চিন্তা অন্যের ভালো লাগলেই বইপ্রকাশ স্বার্থক হবে।’

বিকেলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে বই বিক্রি করছিলেন দুই তরুণ। একজন দুই হাতে আর্টপেপারে লাল কালিতে লেখা ‘শিক্ষা নিয়ে মনিষীদের প্রবন্ধ সংকলন’। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, শিক্ষাসভা নামে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের একটি সংগঠন গড়ে তুলেছেন তারা। সেখান থেকেই ওই প্রবন্ধ সংকলন প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে স্থান পেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আইনস্টাইন, কাজী নজরুল ইসলাম, সুভাষ চন্দ্র বসুসহ অনেকেই।

গাজিপুরের ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের তৃতীয় বিভাগের শিক্ষার্থী আনোয়ার জানালেন, শিক্ষা নিয়ে বড় বড় মনিষীরা কী ভাবছেন, তা জানাতেই এ বইয়ের প্রকাশ। তা ছাড়া তারা নিয়মিত একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। অল্প প্রকাশনা বলেই গেইটের বাইরে তারা বইগুলো বিক্রি করছেন।

নতুন বই : বাংলা একাডেমির তথ্যানুযায়ী শনিবার মেলায় নতুন ১৫৫টি বই এসেছে। এর মধ্যে গল্প ৩০, উপন্যাস ২৫, প্রবন্ধ ৯, কবিতা ৩৮, গবেষণা ১, ছড়া ৮, শিশুসাহিত্য ৭, মুক্তিযুদ্ধ ২, বিজ্ঞান ৮, ভ্রমণ ২, ইতিহাস ৩, কম্পিউটার ১, ধর্মীয় ২, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী ১ এবং অন্যান্য বিষয়ে ১৭টি। উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে অন্যপ্রকাশ থেকে কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হকের ‘সেরা দশ গল্প’, অনন্যা থেকে ইমদাদুল হক মিলনের ‘ছোট সবুজ মানুষ’, অনুপম থেকে মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘অন্য জীবন’, বেঙ্গল পাবলিকেশনস থেকে সৈয়দ শামসুল হকের ‘বালিকা চন্দ্রযান ও অন্যান্য’, আগামী প্রকাশনী থেকে আহমদ শরীফের ‘উজান স্রোতে কিছু আষাঢ়ে চিন্তা’, সুমন্ত আসলামের ‘ইডিয়ট আনলিমিটেড’, রোদেলা এনেছে আবদুল মান্নান সৈয়দের ‘নজরুল ইসলাম কবি ও কবিতা’, জার্নিম্যান বুকস এনেছে মুনতাসির মামুনের ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কাপুরুষ সৃষ্টি করেনি কখনও,’ আতিউর রহমানের ‘বঙ্গবন্ধু সহজপাঠ,’ কথাপ্রকাশ এনেছে মুনতাসির মামুনের ‘জেনারেলের সঙ্গে,’ নাসির আলী মামুনের ‘আলাপন’, মাহী প্রকাশন এনেছে বেলাল চৌধুরীর ‘সেরা কিশোর গল্প,’ অনিন্দ্য প্রকাশনী এনেছে মোস্তাক আহমদের ‘ইলু পিশাচ’, রাতুল গ্রন্থ প্রকাশ এনেছে দীপু মাহমুদের ‘তোতা,’ আলম তালুকদারের ‘জোলার ছানা ভূতের ছানা,’  পবিত্র সরকারের ‘নাতি গণেশের বুড়ি,’  শিরিন পাবলিকেশন্স এনেছে শাহরিয়ারের ‘বেসিক আলী আর্ট,’ আদর্শ এনেছে প্রবাস আমীনের ‘স্পেটিংলি নাও,’ অন্যপ্রকাশ এনেছে কবি মহাদেব সাহার ‘হাতে অমৃতকুম্ভ পান করি বিষ,’ অন্বেষা প্রকাশনী এনেছে ডা. প্রাণ গোপাল দত্তের ‘হৃদয় আমার’।

মূল মঞ্চের আয়োজন : বিকেল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘ফোকলোর কর্মসূচি, অতীত থেকে বর্তমান’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড. ফিরোজ মাহমুদ। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন ভারতের কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের অধ্যাপক অসীমানন্দ গঙ্গোপাধ্যায়, শাহিদা খাতুন, নন্দলাল শর্মা এবং সাইফুদ্দীন চৌধুরী। সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করে অসীম সাহার পরিচালায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘সহজিয়া’র শিল্পীরা। সংগীত পরিবেশন করেন কণ্ঠশিল্পী বারী সিদ্দিকী, আকরামুল ইসলাম, দিল আফরোজ রেবা, চন্দনা মজুমদার ও আবদুল হালিম খান।

রোববার মূল মঞ্চের আয়োজন : রোববার (৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘অনুবাদ কার্যক্রম, অতীত থেকে বর্তমান’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন এবার বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত অনুবাদক অধ্যাপক আবদুস সেলিম। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন ড. নিয়াজ জামান, অধ্যাপক কাজল বন্দ্যোপাধ্যায়, ড. ফকরুল আলম ও আবদুল্লাহ আল মামুন। সভাপতিত্ব করবেন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। এ ছড়া প্রতিদিনকার মতো সন্ধ্যায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

Print
1547 মোট পাঠক সংখ্যা 1 আজকের পাঠক সংখ্যা

About admin

Close