অজ্ঞাত শিশুটি দীর্ঘ ২৮ দিন পর ফিরে পেল মায়ের কোল

এক্সপ্রেস ডেস্ক: পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রচারণায় দীর্ঘ ২৮ দিন অজ্ঞাত অবস্থায় চিকিৎসা পাওয়া শিশুটির পরিবার পরিজনের খোঁজ পাওয়া গেছে। টানা ২৮ দিন কোমায় থাকা শিশুটি উন্নত চিকিৎসা পাওয়ায় মৃত্যুর দোর থেকে ফিরে অনেকটা স্বাভাবিকভাবে কথাও বলছে। নিজের নাম, পরিবার পরিজনের পরিচয় এমনকি বাড়ির ঠিকানা বলতে পারছে সে। ঢাকা সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে শিশুটির উন্নত চিকিৎসা চলছে। জানা গেছে, শিশুটি নাম বেলাল হোসেন (১১)। সে যশোরের শার্শা উপজেলার উলাশীর  নোয়াপাড়া ধল্যাপাড়া গ্রামের জোহর আলীর ছেলে। মায়ের নাম ফাতেমা বেগম লেবু। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয়েছে অনেক আগেই। তার মা ফাতেমা বেগম জানান, বেলাল উলাশীর ধল্যাপাড়ায় তার মামার বাড়ি থাকত। তার বাবা নাভারণে থাকে। মায়ের বাধা অমান্য করে সে চলে আসে যশোরে। কাজ নেয় গরীবশাহ সড়কের রফিক নামে একটি খাবার হোটেলে। এখানে কয়েক মাস কাজ করে সে। এর মধ্যে কাজ করতে গিয়ে পা কেটে যায় তার। এ সময় রক্তপাতও হয় খুব। শারীরিক দুর্বলতা নিয়ে মায়ের বারণ না শুনে পাওনা টাকার জন্য যশোর আসে বেলাল। হোটেল মালিক তাকে পুরো টাকা না দিয়ে ২শ’ টাকা দিয়ে বিদায় দেয়।

গত ৯ জানুয়ারি সন্ধ্যায় নিজ গ্রামে ফেরার জন্যে উঠে পড়ে বাসে। চাঁচড়া মোড় থেকে বাসের ছাদে চড়ে যাচ্ছিলো সে। পথিমধ্যে নাভারণ আকিজ বিড়ি ফ্যাক্টরির সামনে পৌঁছালে বাসের ছাদ থেকে পড়ে যায়। গুরুতর অবস্থায় স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে। কালাম নামে এক ব্যক্তি তাকে যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে যায়। ওই সময় বেলালের জ্ঞান ছিলো না। কারোরই জানা ছিলো না তার নাম ও পরিচয়। অজ্ঞাত হিসেবেই তাকে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে হাসপাতালের ডাক্তার ও স্বাস্থ্যসেবীরা। বেলালের অবস্থা এতোটাই সংকটাপন্ন ছিলো যে ডাক্তাররা ধরেই নিয়েছিলেন তাকে বাঁচানো সম্ভব না। তার চিকিৎসার ক্ষেত্রেও ছিলো সীমাবদ্ধতা। প্রয়োজনীয় ওষুধ সেবন করানো ও পরীক্ষা নিরীক্ষা সম্ভব হচ্ছিলো না। অর্থ যোগানের অভাবে শিশুটি মৃত্যুর ঝুঁকিতে পড়ে যায়।  বিষয়টি নজরে আসে গ্রামের কাগজের সাংবাদিক আশিকুর রহমান শিমুলসহ অন্য সাংবাদিকদের। তারা যে যার জায়গা থেকে ছেলেটিকে নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করেন।

১১জানুয়ারি গ্রামের কাগজের ফটো সাংবাদিক সাজ্জাদুল কবির মিটনের তোলা একটি ছবি প্রকাশিত হয়। কিন্তু তাকে সনাক্ত করার জন্যে কেউ আসে না। হাসপাতালের চিকিৎসক ও সেবিকা, সাহায্য সংস্থা মেডিসিন ব্যাংক, রোগী কল্যাণ সমিতি ও অন্য রোগীর স্বজনরা তার চিকিৎসার দেখভালের দায়িত্ব নেন। কিন্তু সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের অভাবে তেমন কোন উন্নতি হচ্ছিল না। মানবতার খাতিয়ে এগিয়ে আসেন শহরের ঘোপ নওয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা তিতাস আহমেদ, জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি ফয়সল খান, নগর ছাত্রদল নেতা তানভির আহমেদ জুয়েল, ছাত্রনেতা জহুরুল হক শিমুল। তাদের তত্ত্বাবধানে যশোরে সম্ভব সব ধরণের চিকিৎসা শুরু হয়। কিন্তু জ্ঞান ফেরে না বেলালের। অসাড় অবস্থায় পড়ে থাকে সে। ডাক্তারের পরামর্শ ছিলো তাকে একটা সিটি স্ক্যান পরীক্ষা করানোর। এগিয়ে আসে শহরের ল্যাবস্ক্যান মেডিকেল সার্ভিসেস কর্মকর্তারা। বিনামূল্যে তার সিটিস্ক্যান পরীক্ষাটি করিয়ে দেন তারা। ২২ জানুয়ারি বেলালকে সুস্থ করে তোলার মানষিকতা নিয়ে হাসপাতালে ছুটে যান গ্রামের কাগজের সাব এডিটর শাপলা রহমান ও স্টাফ রিপোর্টার উজ্জ্বল বিশ্বাস। ইতোমধ্যে সংবাদকর্মীদের মধ্যে বিষয়টি আলোড়ন সৃষ্টি করে। এরই পরে জাতীয় যুব ঐক্যের যশোর জেলা সভাপতি আবু মুছা, প্রেসক্লাব যশোরের সভাপতি জাহিদ হাসান টুকুন তাকে দেখতে হাসপাতালে ছুটে যান। তাকে ২২ জানুয়ারি দেখানো হয় ঢাকা বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে আগত নিউরো মেডিসিন বিশেষজ্ঞ শফিউল্লাহ সবুজকে। তার দেয়া ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী পরীক্ষা নিরীক্ষা ও নাকে নল দিয়ে খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। সাড়া পাওয়া যায় যশোরের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের। উন্নত চিকিৎসার জন্যে বেলালকে ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্স এন্ড হসপিটালে নেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। শাপলা রহমান, উজ্জ্বল বিশ্বাস, আবু মুছা চিকিৎসা সহায়তাসহ তাকে দেখভালের দায়িত্ব নেন। বেলালকে ২৪ জানুয়ারি রাতে যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে শাপলা রহমান ও উজ্জ্বল বিশ্বাস জিম্মায় নিয়ে রাত ১০টায় কুইন্স হসপিটাল কর্তৃপক্ষের দেয়া এ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় নেন। এ সময় উজ্জ্বল বিশ্বাস,আবু মুছা ও তার স্ত্রী শারমিন শীলা সাথী ছেলেটির সাথে ঢাকায় যান। ঢাকায় চিকিৎসা ও দেখভালের জন্য ছুটে আসেন জাসদ ছাত্রলীগের (নি-সু) সাবেক সভাপতি ও জাতীয় যুব ঐক্যের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি এসএম সামছুল আলম নিক্সন। তিনিই আবু মুছা তার স্ত্রী সাথীর সাথে দায়িত্ব সহকারে বেলালের চিকিৎসা ব্যবস্থায় সার্বক্ষনিক চেষ্টায় রয়েছেন। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্স এন্ড হসপিটালে বেড খালি না থাকায় ২৫ জানুয়ারি সকালে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ২৭ জানুয়ারি বেলালকে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্স এন্ড হসপিটালে ভর্তি করে নেয়া হয়। ৯দিন চিকিৎসার পর ৪ ফেব্রুয়ারি সাভারের সিআরপিতে রেফার্ড করা হয়। কিন্তু সেখানে শয্যা সংকুলান না হওয়ায় ভর্তির জন্যে অপেক্ষায় থাকতে হয়। এতো কিছুর পরও অজ্ঞাতই ছিলো বেলাল। জ্ঞানও  ফেরেনি। ওই অবস্থাতেই চলতে থাকে তাকে বাঁচানোর যুদ্ধ।
এরই মধ্যে ৫ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার সকালে যশোর সদর উপজেলার দোগাছিয়া গ্রামের রাসেল নামে একজন ফোন করে ছেলেটিকে তার ভাগ্নে হারুন হিসেবে সনাক্ত করেন। কিন্তু পরে জানা যায় তার তথ্য সঠিক নয়। ওই দিনই যশোর শহরের পুরাতন কসবার একজন ওই ছেলেকে চেনেন বলে গ্রামের কাগজে আসেন। তার দেয়া তথ্য মতে শার্শা উপজেলার উলাশী ধল্যাপাড়া গ্রাম থেকে একটি পরিবার অজ্ঞাত ছেলেটিকে নিজের সন্তান বেলাল দাবি করেন এবং তারা সাভারের সিআরপি হসপিটালে যান। সেখানে গিয়ে ছেলেকে সনাক্ত করেন। ছেলেটির পরিচয় সঠিকভাবে নিশ্চিত হতে আমাদের দু’দিন সময় লেগেছে। যে কারণে এ সংক্রান্ত রিপোর্ট পাঠকদের জানাতে বিলম্ব হয়েছে। এতে গ্রামের কাগজ পরিবার দুঃখ প্রকাশ করছে। বেলালের শরীরের কয়েকটি স্থানে ক্ষত থাকায় সিআরপি কর্তৃপক্ষের পরামর্শে গতকাল ৮ ফ্রেবুয়ারি শহীদ সোরওয়ারর্দী মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালে নেয়া হয়। সেখানে তাকে ক্ষত স্থানে উন্নত চিকিৎসার জন্য অস্ত্রপাচার করা হয়। প্রফেসর ডাক্তার শানজু’র সহযোগিতায় হাসপাতালের আবাসিক সার্জন (জেনারেল সার্জারী) ডাঃ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ আবু আইয়ুব আনসারীর তত্বাবধানে ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ১২ নম্বর বেডে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
এদিকে তার চিকিৎসা জন্য ইতিমধ্যে সহায়তা পাওয়া গেছে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান থেকে। প্রেসক্লাব যশোরের সভাপতি জাহিদ টুকুন ও দৈনিক গ্রামের কাগজ প্রকাশক সম্পাদক মবিনুল ইসলাম মবিন মিলে দায়িত্ব নেন তার চিকিৎসার্থে আর্থিক সহায়তা তহবিল গঠনের। তাদের ডাকে সাড়া দেন যশোরের জেলা প্রশাসকসহ অনেকেই। ৫ হাজার টাকা দিয়েছেন যশোরের জেলা প্রশাসক ডক্টর হুমায়ুন কবীর, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম মিলন ২ হাজার টাকা, রোটারী ক্লাব অব যশোর রূপান্তর ১১ হাজার টাকা, সিটি প্লাাজার স্বত্বাধিকারী এসএম ইয়াকুব আলী ১০ হাজার টাকা, সরকারি এমএম কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ নমিতা রানী বিশ্বাস ৫ হাজার টাকা, জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশন ২ হাজার টাকা, গ্রামের কাগজের চীফ রির্পোটার জুয়েল মৃধা ৩ হাজার টাকা, ডাক্তার আব্দুর রাজ্জাক মিউনিসিপ্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষ ৫ হাজার টাকা ও যশোর সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি সাজ্জাদ গণি খান রিমন ১শ’ টাকা দিয়েছেন। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যক্তি পর্যায় থেকে বিকাশের মাধ্যমে পাওয়া গেছে ৬ হাজার ২শ’ টাকা। এছাড়াও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ৩ ব্যক্তি ২শ’টাকা করে চিকিৎসা সহায়তা দিয়েছেন। সহয়তা পাওয়া অর্থ বেলালের চিকিৎসা কাজে ব্যয় হচ্ছে।  শহীদ সোরওয়ারর্দী মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালের চিকিৎসা শেষে বেলালকে আবারো নেয়া হবে সাভারের সিআরপিতে। সেখানকার চিকিৎসা ব্যয় অনেক। যা বহন করা তার পরিবারের পক্ষে অসম্ভব। ফলে তাকে পুরোপুরি সুস্থ করে তোলার জন্যে আর্থিক সাহায্য প্রয়োজন। তাই সহৃদয়বান ও দানশীল ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের কাছে সাহায্যের জন্যে আবেদন জানানো হচ্ছে। অর্থ সহায়তা করতে যোগাযোগ করুন। জাহিদ হাসান টুকুন, সভাপতি প্রেসক্লাব যশোর। মোবাইল নং ০১৭৮৬৭১৬৬৬৬, মবিনুল ইসলাম মবিন, সম্পাদক গ্রামের কাগজ, মোবাইল নং ০১৭১১৮৩৮১১১ ও ০১৭১৪৪৪৩৯৪১। অর্থ সহায়তা করতে মোবাইল নং ০১৭৮৬৭১৬৬৬৬  বিকাশ করতে পারেন।
Print
1357 মোট পাঠক সংখ্যা 1 আজকের পাঠক সংখ্যা

About admin

Close