যশোর ও অভয়নগরের পথে পথে সংবর্ধনা, ভালোবাসায় সিক্ত শিলা

এক্সপ্রেস ডেস্ক: ফুল আর হৃদয় নিঙরানো ভালোবাসায় স্বাগত জানানো হলো যশোরের মেয়ে জলকন্যা মাহফুজা আক্তার শিলাকে। ঢাকা থেকে আসা একটি যাত্রীবাহী বাস থামিয়ে অভ্যর্থনা জানানো ও সার্কিট হাউজে নিয়ে সংবর্ধনা দেয়ায় আবেগ আপ্লুত হয়েছেন সাউথ এশিয়ান গেমসে দুটি স্বর্ণপদক জয়ী এ জলকন্যা। যশোরের সন্তান হয়ে ফিরে আসা ও আশার থেকে অধিক প্রাপ্তির জন্য এ ক্ষণটিকে জীবনের সেরা মুহূর্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তিনি। বৃহষ্পতিবার যশোরে এসে পৌছালে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে অভ্যর্থনা জানানোর সময় অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি এ কথা বলেন। সাউথ এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের হয়ে সাঁতার প্রতিযোগিতায় অংশ নেন শিলা। গত ৮ ফেব্রুয়ারি ১০০ মিটার এবং পরের দিন ৫০ মিটার  সাঁতার প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়ে স্বর্ণপদক জয় করেন শিলা। গেমস শেষে দেশে ফেরেন ঠিকই; তবে তাকে সরাসরি চলে যেতে হয় ঢাকায়।

সেখানের আনুষ্ঠানিকতা শেষে বৃহষ্পতিবার সকালে যাত্রা করেন গ্রামের বাড়ি যশোরের অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়ার পাঁচকবর গ্রামের উদ্দেশ্যে। স্বর্ণজয়ী এ কৃতি সাঁতারু একটি যাত্রীবাহী বাসে করে আসেন যশোরে। তার আসার খবরে আগে থেকেই যশোর উপশহর বাসস্ট্যান্ডে হাজির হন জেলা প্রশাসক ড. হুমায়ুন কবীর, পুলিশ সুপার আনিছুর রহমান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সাবিনা ইয়াসমিন, জেলা মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সভানেত্রী রুনা লায়লাসহ প্রশাসনের কর্মকর্তাগণ ও স্থানীয় ক্রীড়ানুরাগীরা। বাসটি উপশহর বাসস্ট্যান্ডে পৌছানো মাত্রা ফুল দিয়ে বরণ করে নেয়া হয় জলকন্যা শিলাকে। মেয়েকে স্বাগত জানাতে আগে থেকে সেখানে উপস্থিত ছিলেন তার বাবা আলী আহম্মদ গাজী ও মা করিমন নেছা। দেশের জন্য গর্ব বয়ে আনা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে তারা আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। এসময় শিলার সাথে তার পিতা-মাতাকেও ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান প্রশাসনের কর্মকর্তারা। পরে সেখান থেকে শিলাকে নিয়ে যাওয়া হয় সার্কিট হাউজে। সার্কিট হাউজে মিষ্টি মুখের পাশাপাশি শিলাকে সংবর্ধনা দেয়া হয়।

এসময় জেলা প্রশাসক ড. হুমায়ুন কবীর বলেন, শিলা দেশের জন্য সম্মান বয়ে এনেছে। সে এখন কেবল যশোরের মেয়ে নয়, সারা বাংলাদেশের মেয়ে। সারা বাংলাদেশকে সে প্রতিনিধিত্ব করেছে। তাকে সম্মানীত করতে পেরে আমরা আনন্দিত। তিনি বলেন, আগামীকাল নওয়াপাড়াবাসীর পক্ষে তাকে সংবর্ধনা দেয়া হবে। এরপর জেলা শহরেও তাকে ব্যাপক আয়োজনে সংবর্ধনা দেয়া হবে।  জেলা প্রশাসক বলেন, শিলার বাড়িতে বিদ্যুতের সমস্যা ছিল সেটা সমাধান করা হয়েছে। বাড়িতে প্রবেশের রাস্তাটি সংস্কারে পৌরসভার সাথে কথা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, অভাবের কারণে শিলার ইতিপূর্বে অর্জিত স্বর্ণপদকের যে সোনা বিক্রি করা হয়েছিল, সেই পদক ফের সোনা দিয়ে মুড়ে দেয়া হয়েছে। আগামীকাল নওয়াপাড়ায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সেটি তাকে দেয়া হবে। তিনি বলেন, শিলার ছোট বোনের শিক্ষার ভারও নেবে জেলা প্রশাসন। তার সাথে কথা বলে বসত ভিটায় নতুন বাড়িও করে দেয়া হবে। তাদের স্বচ্ছল পরিবেশে ফেরাতে সব করা হবে।

জেলা প্রশাসক আরো বলেন, শিলাকে দেখে শুধু যশোর নয় সারা বাংলাদেশের মেয়েরা যাতে উৎসাহী হয় এবং দেশের জন্য যাতে আরো বেশি সম্মান বয়ে আনতে পারে সেজন্যই এ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।  অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে জলকন্যা মাহফুজা আক্তার শিলা বলেন, বলে বা দেখিয়ে বোঝানো যাবে না; এগুলো মানুষ বুঝতেও পারবে না সেরকম একটি অনুভূতি পেয়েছি। আমি বাস থেকে নামার পর জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ যশোরবাসী যে অভ্যর্থনা দিয়েছে তাতে আমি বাকরুদ্ধ। অনেকদিন পর বাবা-মাকে সামনে পেয়ে খুব কান্না পাচ্ছিল। আসলে এটা ভালো লাগার কান্না। তিনি বলেন, সোনার মেয়ে হয়ে বাবা-মায়ের কোলে ফিরেছি, কিন্তু যশোরের বুকে যশোরের মেয়ে হয়ে ফিরতে পারা অনেক সৌভাগ্যের। তাছাড়া আমাকে ও আমার পরিবারকে যেসব সুযোগ সুবিধা দেয়া হচ্ছে সবমিলিয়ে এ পাওয়া আমার সারাজীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন। কারণ আমি যা আশা করিনি তার থেকে বেশি পেয়ে গেছি। ভবিষ্যত পরিকল্পনা সম্পর্কে শিলা বলেন, আগামীতে অলিম্পিক গেমস আছে। আমার টার্গেট সেখানে অংশ নেয়া ও দেশের জন্য আবারো স্বর্ণ জয় করা। ইতিপূর্বে সিলেকশন বোর্ডের অনেক অভিযোগের বিরুদ্ধে নিজেকে প্রুফ করেছি। ফলে যদি সিলেকশন করা হয় তাহলে অলিম্পিকের জন্য প্রস্তুতি নিতে চাই।

মেয়ের প্রাপ্তি দেখে গর্বিত শিলার পিতা-মাতাও। শিলার পিতা আলী আহম্মদ গাজী  বলেন, আমার মেয়েকে মানুষ এত ভালোবাসা জানাচ্ছে দেখে খুব ভালো লাগছে। মেয়ের কল্যাণে বাড়িতে বিদ্যুৎ পেয়েছি, রাস্তা হবে, বাড়ি হবে এসব ভেবে খুব ভালো লাগছে। তবে গর্বিত এ পিতা জানালেন তার একটাই প্রত্যাশা, মেয়ে যাতে অলিম্পিক গেমসে অংশ নিতে পারে। দেশের জন্য সুনাম আনতে পারে। সার্কিট হাউজের আনুষ্ঠানিকতা ও দুপুরের খাওয়া শেষে শিলা তার গ্রামের বাড়ি অভয়নগরের নওয়াপাড়ার উপশহরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। এরপর অভয়নগর উপজেলার প্রেমবাগ স্কুল মাঠ থেকে শত শত মোটরসাইকেল, মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার শোভা যাত্রা করে নওয়াপাড়া বাজার হয়ে রাজঘাটে নিয়ে যাওয়া হয় শিলাকে। এ সময় রাস্তার দু’ পাশে হাজার হাজার মানুষ হাতে ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে শিলাকে সংবর্ধনা প্রদান করে। তাদের ভালোবাসা পেয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন শিলা। শিলার আগমন আগে থেকে মাইকে প্রচার করায় গতকাল নওয়াপাড়ায় জনতার ঢল নেমেছিলো। এশিয়ান গেমসে সাঁতারে দ্রুত সময়ে গন্তব্যে পৌছালেও গতকাল ১৫ কিলোমিটার পথ মোটর শোভাযাত্রা করে তার পাড়ি দিতে সময় লাগে দেড় ঘন্টা। উপজেলা সদরে মানুষের ভালোভাসায় সিক্ত হয়ে ফিরে যান নিজ বসতভিটায়। শিলাকে বরণের সময় উপস্থিত ছিলেন অভয়নগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সিফাত মেহনাজ, নওয়াপাড়া পৌর মেয়র সুশান্ত দাস শান্ত, এসি ল্যান্ড রাজিব আহসান, ক্রিড়া সংগঠক মঈনুর জহুর মুকুল, কাউন্সিলর রবিন অধিকারী ব্যাচা, ব্যবসায়ীক নেতা শাহ জালাল হোসেন, রেজাউল হোসেন বিশ্বাসসহ অসংখ্য সুধীজন।

এছাড়া শিলার আগমন উপলক্ষে সর্বত্র সাজ সাজ রব লক্ষ্য করা গেছে। বড় বড় ছবি দিয়ে শিলার রং- বেরঙের পোস্টার, প্যানা ঝুলছে সর্বত্র। অভয়নগর উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সর্বস্তরের জনগনের অংশ গ্রহনে আগামীকাল শুক্রবার উপজেলার নওয়াপাড়া শংকরপাশা মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে শিলাকে গণসংবর্ধনা দেয়া হবে। এ ব্যাপারে সব ধরণের প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। শিলাকে গণসংবর্ধনা দিতে মঙ্গলবার বিকেলে অভয়নগর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে গণসংবর্ধনা সফল ও সার্থক করতে দু’টি কমিটিও গঠন করা হয়েছে।

Print
1372 মোট পাঠক সংখ্যা 1 আজকের পাঠক সংখ্যা

About admin

Close