নড়াইলে পুরোহিত সেবায়েত যাজকদের ভয়ের জীবন

এক্সপ্রেস ডেস্ক: নড়াইলে হিন্দু মন্দিরের পুরোহিত, সেবায়েত ও খ্রিস্টান গির্জার যাজকরা ভয়ানক আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে ধর্মগুরুরা বলছেন, এভাবে পাহারাদার নিয়ে ধর্মকর্ম করা যাবে কতদিন? অস্বস্তিকর অবস্থায় ধর্মচর্চায় মনোনিবেশ করা সম্ভব নয়। সম্প্রতি নড়াইলের সন্তান ঝিনাইদহের একটি মন্দিরের সেবায়েত শ্যামানন্দ দাস জঙ্গিদের হাতে খুন হন। জেলার একটি গির্জার ফাদারকে টেলিফোনে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। চিঠি পাঠিয়ে খুনের হুমকি দেওয়া হয় তিন পুরোহিতকে। এসব ঘটনায় আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েন পুরোহিত, সেবায়েত, যাজকরা।
নড়াইল সদরের কলোড়া ইউনিয়নের মুশুড়ী গ্রামের ছেলে শ্যামানন্দ দাস। মাত্র ১৩ বছর বয়সে গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর টানে বাড়ি ছাড়েন তিনি। ঝিনাইদহের একটি মঠে ধর্মসেবায় মনোনিবেশ করেছিলেন শ্যামানন্দ। গত ১ জুলাই পুজোর জন্য ফুল তোলার সময় মন্দিরের কাছে জঙ্গিরা  তাকে কুপিয়ে নির্মমভাবে খুন করে।
নিরপরাধ, সদালাপী, সংসারবিবাগী শ্যামানন্দের এই নির্মম হত্যাকা-  মেনে নিতে পারেনি কেউ।
শ্যামানন্দ দাসের বড়ভাই সুধাংশু সরকার বলেন, ‘সন্ন্যাসীর কোনো শত্রু থাকে না। তাকেও যদি খুন হতে হয়, তাহলে আমাদের কী হবে?’
শ্যামানন্দ খুনের কিছুদিন আগে মুলিয়া ইউনিয়নের এক ক্যাথলিক ফাদারকে অজ্ঞাত ব্যক্তিরা টেলিফোনে হত্যার হুমকি দেয়। গির্জাটিতে প্রায় দুই মাস ধরে চারজন করে পুলিশ সদস্য ২৪ ঘণ্টা পাহারা দিচ্ছেন।
আতঙ্কময় এই পরিবেশের মধ্যে গত ২২ জুলাই সদর উপজেলার আগদিয়ার চর মহাশ্মশান সেবাশ্রম মন্দিরের পুরোহিত উত্তম গোসাঁই, শ্রীশ্রীহরিগুরুচাঁদ মতুয়া মিশন সেবাশ্রমের প্রধান সেবক বিমল গোসাঁই এবং নলদির চর সর্বজনিন দুর্গা মন্দিরের পুরোহিত সুজিত গোসাঁইকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে উড়ো চিঠি দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এতে ধর্মগুরুদের আতঙ্ক বেড়েছে আরেক দফা।
সরেজমিন সদরের মুলিয়া, শেখহাটি, আগদিয়া, কলোড়া, শিংগাশোলপুরের হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, মন্দিরগুলো একেবারে নিস্তব্ধ; খা খা করছে। পূজারীরা পূজা-অর্চনা করতে সকাল-সন্ধ্যা মন্দিরে আসছেন না।
আগদিয়ার চর মহাশ্মশান সেবাশ্রম মন্দিরে তালা ঝুলতে দেখা যায়। মন্দিরের পুরোহিত উত্তম গোসাঁই প্রায়ই সেবাশ্রম বন্ধ করে নিরাপদ অবস্থানে থাকেন। তার সঙ্গে দেখা হলো গোবরা বাজারে। বললেন, ‘যেভাবে চারিদিকে পুরোহিত-সেবাইতদের বিনাকারণে হত্যা করা হচ্ছে, আতঙ্কিত হওয়াই স্বাভাবিক। তার ওপর খুনের হুমকিসম্বলিত চিঠি পেয়ে আতঙ্কের মাত্রা বেড়েছে। নিরাপত্তাহীনতার কারণে সবসময় মন্দিরে থাকতে সাহস পাই না।’
নলদীর চর সর্বজনিন হরি মন্দিরের সেবায়েত সুজিত হালদার বলেন, ‘চিঠি পাওয়ার পর থেকে আতঙ্কে আছি। সেই রাত থেকে আশ্রমে ঘুমাতে সাহস পাচ্ছি না। স্থানীয় একজন কলেজশিক্ষকের বাড়িতে থাকছি। প্রতিদিন রাতে যে ভগবত পাঠ এবং নামজপ হতো, তা এখন সন্ধ্যার আগেই শেষ করতে হচ্ছে।’
মন্দিরে নিয়মিত পূজা-অর্চনা করেন স্থানীয় মমতা বৈরাগী। তিনি বলেন, ‘এখন আমাদের মাঝে এমন আতঙ্ক বিরাজ করছে যে, সন্ধ্যার পরপরই ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে রাখি। রাতে কোনো মোটরসাইকেলের শব্দ শুনলে ভয়ে ঘুম ভেঙে যায়। কখন যেন শুনি আমাদের গোসাঁইয়ের কোনো খারাপ খবর। আতঙ্কের কারণে রাতে ঠিকমতো ঘুমাতেও পারি না।’
পাশের আগদিয়ারচর গ্রামের আরেক আশ্রমের নাম শ্রীশ্রীহরিগুরুচাঁদ সর্বজনিন মতুয়া মিশন সেবাশ্রম। এখানকার সেবায়েত বিমলকৃষ্ণ গোসাঁই মন্দিরে পূজা করতে যেতে ভয় পান। বললেন, ‘ঝিনাইদহে সেবায়েত পূজার ফুল তোলার সময় খুন হয়েছেন। আমাদের এখন পূজাও করতে হচ্ছে সন্তর্পণে।’
‘ভক্তরা ভয়ে নিয়মিত আসছেন না। তাছাড়া রাতে আমরা যে নামযজ্ঞ করতাম তাও বন্ধ করে দিয়েছি। কবে যে আবার সব ঠিক হবে বুঝতে পারছি না।’
এদিকে, গত ২২ তারিখ থেকে এলাকার দুইজন পুরোহিতকে পাহারা দিতে ১০-১২ জনের একটি দল গঠন করা হয়েছে। তারা প্রতিদিন রাত আটটা থেকে ভোর অবধি মন্দির আর সেবায়েতে থাকার জায়গা পাহারা দেন। এরকম একজন পাহারাদার শিশির দাস।
তিনি বলেন, ‘রাতে পাহারা দিতে গিয়েও ভয় লাগে। আমাদের কাছে তো লাঠি থাকে। শুনেছি ওরা ধারালো অস্ত্র আর বন্দুকও আনে। সেদিন বাগানে কতগুলো লোক দেখে তো মনে করেছিলাম এই বুঝি জঙ্গির কবলে পড়লাম! পরে দেখলাম তারা চোর।’
‘এভাবে পাহারা দিয়ে আমরা ধর্ম পালন করব কতদিন?’- প্রশ্ন শিশির দাসের।
মন্দিরের পাশে বাড়ি আশি বছরের সূর্যকান্দ দাসের। কথা বলতে বলতে তার গলা ভারী হয়ে আসে। বলেন, ‘একাত্তর সালে আমরা ভয়ে ভারতে চলে গেছিলাম। এরপর তো শান্তিতেই ছিলাম। এখন আবার সেই ভয় আমাদের মধ্যে ঢুকেছে। আমাদের ঠাকুরকে কবে না জানি মেরে ফেলে এই ভয়ে থাকি সারাক্ষণ। আমাদের ভিটেছাড়া করার জন্যই কি এসব করছে?
একটু পরেই অবশ্য দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, ‘যতই ভয় দেখাক, আমার চৌদ্দপুরুষের এই ভিটা ছেড়ে কোথাও যাব না। এটা আমারই দেশ। কেন ভারতে যাব?’
এলাকার হিন্দু নারীরাও রয়েছেন আতঙ্কে। পুরুষেরা নানা কাজে বাইরে থাকে। তারা রাতে বাড়ি ফিরতে একটু দেরি হলেই ভয় ঢোকে নারীদের মনে।
আগদিয়ার চর গ্রামের গৃহবধূ টুকুরানি বাগচী বলেন, ‘চারিদিকে যা হচ্ছে, তাতে ভয় না পেয়ে উপায় আছে? এভাবে সন্ধ্যা লাগার সাথে সাথে দুয়ার দিলে কাজকাম কীভাবে করব? এখন চোর-ডাকাতের চেয়ে মন্দির আর সেবায়েতের ওপর হামলার ভয় বেশি।’
নড়াইল জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অশোককুমার কু-ু বলেন, ‘আমাদের এখানে আগে থেকে একটু ভীতিকর পরিবেশ ছিল। তবে তিন পুরোহিতকে হত্যার হুমকি দিয়ে চিঠি দেওয়ার পরে আমরা কিছুটা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছি। এখন গত কয়েকদিন যাবৎ সান্ধ্যকালীন পুজো কিছুটা এগিয়ে এনে বিকেলে শেষ করার জন্য বলেছি। যেন সন্ধ্যার পরে পুরোহিতদের মন্দিরে না থাকতে হয়।’
‘তবে পুলিশ প্রশাসন যথেষ্ট তৎপর’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সকাল-সন্ধ্যা দুবেলা পুলিশের লোকেরা টাউন কালিবাড়িতে এসে খোঁজ নেন।’
নড়াইলের সহকারী পুলিশ সুপার মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘উড়ো চিঠি আসা মন্দিরগুলোতে পুলিশ সুপারসহ আমরা কয়েকবার গিয়েছি। চিঠিগুলো একই হাতে লেখা। আমরা এগুলো পর্যবেক্ষণ করছি। কারো কোনো শত্রুতা আছে কি-না তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দ্রুতই চিঠি লেখকদের খুঁজে বের করা হবে। এলাকার জনগণকে নিয়ে প্রত্যেক মন্দিরে ভিলেজ ডিফেন্স পার্টি গঠন করে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় চৌকিদার তো আছেই, এছাড়াও সর্বক্ষণিক পাহারার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।’
‘একটি মন্দিরে জমিজমা সংক্রান্ত জটিলতা আছে। তাছাড়া চিঠিগুলো ডাকে আসেনি। কেউ বাইরে ফেলে রেখে গেছে। আমরা ধরে নিচ্ছি স্থানীয় কেউ এগুলো করে থাকতে পারে। তদন্ত চলছে। মন্দির এবং পুরোহিতদের নিরাপত্তার ব্যাপারে প্রশাসন অত্যন্ত সজাগ আছে’, বলছিলেন জেলার এই সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা।

Print
966 মোট পাঠক সংখ্যা 3 আজকের পাঠক সংখ্যা

About Jessore Express

Close