জেলখানার বদলে তাঁরা হাসপাতালে

এক্সপ্রেস ডেস্ক: জটিল রোগ নেই। কখনো ঘাড়ে ব্যথা, কখনো পিঠে ব্যথা আবার কখনোবা বুকে ব্যথার কথা বলে স্থায়ীভাবে হাসপাতালে আশ্রয় নিচ্ছেন প্রভাবশালী আসামিরা। দিনের পর দিন চিকিৎসা নিচ্ছেন। কিন্তু রোগ সারছে না। হাসপাতাল ও কারাগারের কোনো কোনো সূত্র বলছে, কারাগারে অবস্থান এড়ানোর জন্য কৌশল অবলম্বন করছেন অনেক আসামি। এঁদের মধ্যে বিচারাধীন আসামিদের পাশাপাশি দণ্ডিত ব্যক্তিরাও আছেন।

গত বুধবার ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ডিভিশনপ্রাপ্ত কয়েদিদের ছয়জন ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। এঁরা হলেন নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলার আসামি তারেক সাঈদ মোহাম্মাদ, অর্থ পাচার মামলার আসামি ও ডেসটিনি-২০০০-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফিকুল আমীন, অস্ত্র মামলার আসামি মিজানুর রহমান, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, হত্যা ও বিস্ফোরক মামলার আসামি সিলেটের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, বরিশালের ফৌজিয়া আক্তার চাঁপা হত্যা মামলার আসামি জহিরুল আলম কামাল। এর বাইরে মাদক মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আমীন হুদা, পুলিশের শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকাভুক্ত খুনের মামলার আসামি তোফায়েল আহমেদ জোসেফও আছেন হাসপাতালে। জোড়া খুন মামলার আসামি ও সাংসদপুত্র বখতিয়ার আলম (রনি) প্রায় দেড় মাস তিনটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। পত্রিকায় খবর বেরোবার পর গত বৃহস্পতিবার তাঁকে কারাগারে ফেরত পাঠানো হয়।

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের কারাধ্যক্ষ মো. নেছার আলম বলেন, ‘কারাবন্দীরা শারীরিক অসুস্থতার কথা জানালে কারা চিকিৎসকেরা প্রথমে পরীক্ষা করে দেখেন। যদি তাঁরা মনে করেন, কারাগারে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব নয়, তখন তাঁদের বাইরের হাসপাতালে পাঠানো হয়।’ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, প্রভাব-প্রতিপত্তি আছে এমন কয়েদিরা প্রায়ই রিমান্ডের আগে বা আদালতে হাজিরার আগে বুকে ব্যথার কথা বলেন। কারা কর্তৃপক্ষ ভয়ে তখন তাঁদের হাসপাতালে পাঠাতে বাধ্য হয়। রাজধানীর সবচেয়ে বড় চারটি হাসপাতালের প্রশাসনে যুক্ত বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে এ নিয়ে কথা হয়। তাঁরা বলেন, আলোচিত ব্যক্তিদের হাসপাতালে থাকার বিষয়টি দাপ্তরিকভাবে অনুমোদন করেন কারা প্রশাসনের কোনো কোনো সদস্য ও চিকিৎসক। কারা কর্তৃপক্ষ নিয়ম অনুযায়ী প্রতি মাসে কয়েদির শারীরিক অবস্থা কেমন জানতে চেয়ে হাসপাতালে চিঠি দেয়। হাসপাতালের চিকিৎসকেরা নানাভাবে প্রভাবিত হয়ে লিখে দেন, রোগী হাসপাতাল ছাড়ার উপযুক্ত নন। তবে এরপরও কারা কর্তৃপক্ষ চাইলে নিজ দায়িত্বে রোগীকে নিয়ে যেতে পারে। আদালতে শুনানি বা হাজিরার জন্য নির্ধারিত দিনের আগেও এ ধরনের সনদ দিয়ে থাকেন চিকিৎসকেরা, যার ফলে আসামিরা আদালতে হাজিরা এড়াতে পারেন। আর বন্দী হিসেবে যেসব সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার কথা নয়, সেগুলো নিশ্চিত করতে এই বন্দীরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো কোনো সদস্যের সাহায্য নিয়ে থাকেন।

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের চিকিৎসক বিপ্লব কান্তি বিশ্বাস বলেন, কারাগারের সাড়ে আট হাজার বন্দীর চিকিৎসায় মাত্র দুজন চিকিৎসক আছেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ নেই বললেই চলে। তাঁর দাবি, ‘যখন আমরা দেখি, রোগী কারাগারে রেখে চিকিৎসা করা সম্ভব নয়, তখনই আমরা অন্য জায়গায় রেফার করি।’ বারডেমের ভিআইপি কেবিনে তিন ভিআইপি: ডেসটিনি-২০০০-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফিকুল আমীন বারডেমের ৬০১ নম্বর কেবিনে আছেন। তাঁর উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস আছে। গতকাল বৃহস্পতিবার তাঁর কক্ষে বিকেলের নাশতা দিয়ে হাতে ১০০ টাকার নোট নিয়ে বেরিয়ে আসছিলেন হাসপাতালের এক কর্মী। প্রথম আলোর প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘রুমটাও ভিআইপি রুম, রোগীও সে রকম ভিআইপি।’ ভিআইপি কেবিন ৮০১-এ আছেন ইয়াবা মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি আমীন হুদা। মেডিকেল রেকর্ডে তাঁর হৃদ্রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হাঁপানি ছাড়াও মাইগ্রেন, সাইনোসাইটিস, নাক ডাকা ও মানসিক রোগের উল্লেখ আছে।

বারডেমের ১১০১ নম্বর ভিআইপি কেবিনে ভর্তি আছেন মির্জা আব্বাস। এ বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে বারডেমে এসে ভর্তি হন। তাঁর মেডিকেল রেকর্ডে হিমোরয়েড, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনির সমস্যা, ইলেকট্রোলাইট ইমব্যালেন্স ও আইবিএস রোগের উল্লেখ আছে। তিনি যে তিনটি মামলায় গ্রেপ্তার আছেন, তিনটিতেই জামিন হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজনৈতিক বন্দীরা নিজ দলের চিকিৎসকদের আনুকূল্য পান। এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে আসা ও থাকার বিষয়টি ওই চিকিৎসকেরা নিশ্চিত করেন। বারডেম লাগোয়া ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালে আছেন বরিশালের আলোচিত চাঁপা হত্যাকাণ্ডের যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্ত জহিরুল আলম কামাল। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বারডেম হাসপাতালের পরিচালক শহীদুল হক মল্লিক বলেন, অসুস্থ অবস্থায় যে-ই আসুক না কেন, তাঁকে ভর্তি নেওয়া হাসপাতালের কর্তব্য।

অবশ্য বারডেম হাসপাতালে প্রশাসনের উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গত বছরের ২ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে বারডেম হাসপাতালে কোনো আসামি না পাঠানোর অনুরোধ করা হয়। তারপরও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আসামিদের পাহারায় পুলিশ ও কারারক্ষী থাকায় অন্য রোগীদের অসুবিধা হয় বলে তাঁদের ভিআইপি কেবিনে রাখতে হচ্ছে। হৃদ্যন্ত্রের সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে প্রবেশ, থ্যালাসেমিয়া নিয়ে কারাগারে ফেরত সাংসদপুত্র রনি: গ্রেপ্তারের পর প্রথমে হৃদ্যন্ত্রে সমস্যার অভিযোগ নিয়ে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে যান বখতিয়ার আলম (রনি)। কোনো রোগ ধরা পড়েনি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) শীর্ষ একজন কর্মকর্তা বলেন, ওই হাসপাতাল প্রশাসনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সহযোগিতায় বখতিয়ার সিসিইউতে একটি শয্যা বাগিয়ে নেন। পরে বিষয়টি জানাজানি হয়ে যায়। অল্প কিছুদিন কারাগারে থাকার পর তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসেন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক রাজ দত্ত বলেন, ‘প্রথমে উনি আমার এখানে এসেছিলেন। কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথা বলে আমি তাঁকে ছেড়ে দিই।’ জানা গেছে, ওই দিনই জরুরি বিভাগ দিয়ে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। হৃদ্রোগের পরিবর্তে তাঁর কোমরে ব্যথা, পানিশূন্যতা, ঘাড়ে ব্যথা, মানসিক রোগের উল্লেখ করা হয় মেডিকেল রেকর্ডে। হাসপাতালের সহকারী পরিচালক আনোয়ারা শরীফ গত বৃহস্পতিবার মেডিকেল রেকর্ড দেখে বলেন, ‘বখতিয়ার আলম থ্যালাসেমিয়াসহ অন্যান্য রোগে ভুগছিলেন।’ সূত্রগুলো বলছে, ব্যাপক সমালোচনার মুখে বখতিয়ারের বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ১৪ সদস্যের একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করে। সোমবার ওই বোর্ড বসে সিদ্ধান্ত নেয়, বখতিয়ারকে কারাগারে ফেরত পাঠানো হবে। বৃহস্পতিবার তাঁকে কারাগারে ফেরত নিয়ে যায় কারা কর্তৃপক্ষ। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আরও আছেন নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলার আসামি তারেক সাঈদ ও সিলেটের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। তারেক সাঈদ বুকে ব্যথার কথা বলে কারাগার ছেড়ে হাসপাতালে ওঠেন, এখানে আসার পর একটার পর একটা রোগে ভুগছেন। এখন তিনি ভুগছেন জ্বর ও জন্ডিসে।

এ ছাড়া শীর্ষ সন্ত্রাসী জোসেফ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোসার্জারি বিভাগে ভর্তি আছেন প্রায় দুই মাস। প্রায় ১৮ বছর আগে গ্রেপ্তার হওয়া জোসেফের বিরুদ্ধে খুন, চাঁদাবাজি, অবৈধ অস্ত্র বহনসহ ১১টি মামলা ছিল। তিনি এখন একটি হত্যা মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি। এই মামলায় তাঁর মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল। পরে আপিল বিভাগের রায়ে শাস্তি কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত। মিটফোর্ড হাসপাতালে মিজানুর রহমান: গত বছরের ৫ অক্টোবর মিজানুর রহমান স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালের সার্জারি বিভাগে ভর্তি হন। তখন থেকেই ভিআইপি কেবিন ৩-এ থাকছেন। মেডিকেল রেকর্ডে লেখা আছে, মিজানুর রহমান অ্যাজমা, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হিমোরয়েড ও কানের সমস্যায় ভুগছেন। অন্য সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেলেও তাঁর কানের রোগ আর ভালো হচ্ছে না।

জানতে চাইলে ওই হাসপাতালের নাক-কান-গলা বিভাগের প্রধান মণিলাল আইচ বলেন, ‘আমরাও চাই মিজানুর রহমান কারাগারে ফিরুন। কিন্তু উনি অসুস্থ। ওনার কানে দুটো অস্ত্রোপচার হয়েছে। লাইফ সেভিং স্টেরয়েড নিতে হয়। তার ওপর আদালতের নির্দেশ আছে ৩০ মার্চ পর্যন্ত রেখে চিকিৎসা দেওয়ার।’ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সাবেক বেসরকারি কারা পরিদর্শক গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, যাঁরা ধনী তাঁরা হয় জামিনে মুক্ত থাকেন, নয়তো হাসপাতালে থাকেন। তিনি বলেন, ‘কারাগারে চিকিৎসার যথেষ্ট সুযোগ নেই, এই অজুহাত দিয়ে প্রায়ই প্রভাবশালী আসামিদের পার করে দেওয়া হয়। এত কারাবন্দী আছেন, সেখানের চিকিৎসাব্যবস্থা উন্নত করা হয় না কেন?’

Print
1023 মোট পাঠক সংখ্যা 3 আজকের পাঠক সংখ্যা

About admin

Close