রিজাল ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায় থেকেই সব কলকাঠি

এক্সপ্রেস ডেস্ক: বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জানানোর পরও ফিলিপিন্সের রিজাল ব্যাংকের শাখা থেকে চোরের দল কীভাবে টাকা তুলে নিয়ে যেতে পারলো সে বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন ফিলিপিন্সে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত জন গোমেজ। সিএনএনের সঙ্গে সাক্ষাতকারে তিনি চুরির ঘটনার সঙ্গে রিজাল ব্যাংকের প্রেসিডেন্টের জড়িত থাকার ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, সামান্য একজন ব্যবস্থাপক এতো টাকা একবারে দিয়ে দিতে পারেন ন‍া। প্রবাসী বাংলাদেশীদের কষ্টার্জিত টাকা চুরির পর ফিলিপিন্সের জুয়ার বাজারে চলে যাওয়ার পরও দেশটির এন্টি মানি লন্ডারিং কাউন্সিল (এএমএলসি) তেমন কিছু করতে পারছে না বলে দুঃখ প্রকাশ করলেও রাষ্ট্রদূত বলেছেন, ম্যানিলা যেভাবে তদন্ত করছে তাতে ঢাকা সন্তুষ্ট। প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ থেকে টাকা লোপাট হওয়ায় চুরির ঘটনা তদন্তে এফবিআই এরইমধ্যে ম্যানিলায় উপস্থিত হয়েছে বলে তিনি জানতে পেরেছেন।

ফিলিপিন্সের কিছু বিষয়ে পুরোপুরি সন্তোষ না থাকলেও রাষ্ট্রদূত ম্যানিলা সরকারের পক্ষে ফৌজদারি মামলা এবং আইনগত ব্যবস্থার আশ্বাসে পুরোপুরি সন্তুষ্ট। বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়া প্রথম পাঁচ দেশের অন্যতম ফিলিপিন্সের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না বলেও তিনি নিশ্চিত করেছেন। তবে সিনেট কমিটির শুনানিতে অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকা রাষ্ট্রদূত বলেছেন, শুনানিতে কিছু একটা আড়ালের প্রবণতা ছিলো। ফিলিপিন্সে সিএনএন’এর চিফ করেসপন্ডেন্ট পিয়া হোন্তিভেরোস ইতিহাসের বৃহত্তম ব্যাংক হ্যাকিং কেলেঙ্কারি নিয়ে রাষ্ট্রদূত জন গোমেজের দীর্ঘ সাক্ষাতকার নেন। সেখানে গোমেজ বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান এবং দুঃখ ও বেদনার কথা তুলে ধরেন। প্রবাসী শ্রমিক এবং গার্মেন্টস খাতই বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের প্রধান যোগানদাতা উল্লেখ করে গোমেজ বলেন, এটা খুবই দুঃখজনক যে কঠোর পরিশ্রমে অর্জিত আমাদের মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষদের অর্থ এখানে (ফিলিপিন্সে) ক্যাসিনোগুলোতে ব্যবহার হয়েছে।

১৯৭২ সালেই নবসৃষ্ট স্বাধীন ভূখণ্ডকে স্বীকৃতি প্রদানসহ অন্যান্য বিবেচনায় বাংলাদেশ ও ফিলিপিন্সের মধ্যে আবেগীয় সম্পর্ক বিদ্যমান মন্তব্য করে সাম্প্রতিক এই ঘটনা বাংলাদেশের মানুষের মনে বিরূপ প্রভাব ফেলত পারে বলে আশঙ্কার কথা জানান তিনি। তবে, সঙ্গে তিনি একথাও বলেন, দেশটির সরকার এবং দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তারা পর্যাপ্ত সহায়তা পাচ্ছেন। গোমেজ জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে তথ্য পেয়ে ফিলিপিন্সের এন্টি মানি লন্ডারিং কাউন্সিল (এএমএলসি) ৮ ফেব্রুয়ারি রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং কর্পোরেশনকে (আরসিবিসি) হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে চলে যাওয়া টাকা আটকে রাখতে নির্দেশনা দিয়েছিলো। কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি। ৯ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সকল অর্থ তুলে নেয়া হয়। ‘আমি মনে করি এখানে একটা ত্রুটি রয়েছে।’

এক্ষেত্রে তিনি শ্রীলংকার কথা তুলে ধরে বলেন,  শ্রীলংকায় পাচার হওয়া ২০ মিলিয়ন ইউএস ডলার নিরাপদ কর‍ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পাঠানো একই ধরনের অনুরোধে তা ফ্রিজ করা হয়েছিলো। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে গচ্ছিত বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে গত ৪ ফেব্রুয়ারি ১০১ মিলিয়ন ডলারের সমপরিমান অর্থ হ্যাকাররা চুরি করে। রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংক থেকে এই অর্থ তাদের ক্লায়েন্টদের মাধ্যমে চলে যায় স্থানীয় এক ফরেন এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ীর কাছে। ৮১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার স্থানীয় মুদ্রায় বিনিময়ের পর এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৭০ কোটি পেসো।

এরপর এই অর্থ তিনটি বড় ক্যাসিনোতে চলে যায়। এগুলো হচ্ছে সোলারি রিসোর্ট এন্ড ক্যাসিনো, সিটি অব ড্রিমস এবং মাইডাস। পুরো অর্থ খরচ করে সেখানে জুয়া খেলার জন্য চিপস কেনা হয়েছে। এরপর সেই অর্থ পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে হংকং এর বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে। ক্যাসিনোগুলোর উপর ফিলিপিন্সের এএমএলসি’র নিয়ন্ত্রণহীনতায় বিস্ময় প্রকাশ করে জন গোমেজ বলেন, ক্যাসিনোগুলো ফিলিপিন্সে এবং ক্যাসিনোগুলোতে যদি সব ধরনের অবৈধ অর্থ আসে এবং তা দেশের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয় আর পাচারবিরোধী সংস্থা নিশ্চুপ থাকে তবে তার দায়বদ্ধতা কিসে? “অন্যদেশ থেকে পাচার হয়ে আসা টাকা ক্যাসিনোতে চলে গেলে আর তার জন্য যদি তোমার কোনো দায়িত্ব না থাকে তবে দেশের বাজারে ভাসমান অর্থের ব্যাপারে কি হবে? তুমি কীভাবে তার জন্য দায়বদ্ধ হও?”

সিনেট শুনানির সময় নিজেকে বাইরের কেউ মনে হয়েছে উল্লেখ করে জন গোমেজ বলেন, সেখানে একটি পর্দা অনুভব করেছি আমি।  সিনেটরদের পক্ষ থেকে আরসিবিসি ব্যবস্থাপনাকে যখনই কোনো প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করা হয়েছে সেখানে উপস্থিত রিজাল ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লোরেঞ্জো ট্যান ব্যাংক গোপনীয়তা আইনের কথা বলে জবাবে বিরত থেকেছেন। লরেঞ্জোর কাছ থেকে তারা কোন তথ্যই আদায় করতে পারেননি বলে জানান রাষ্ট্রদূত। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে গোমেজ বলেন, অর্থগুলো নিউইয়র্কের ইউএস ফেডারেল রিজার্ভে গচ্ছিত ছিলো। আমি জানতে পেরেছি তদন্তের জন্য এরইমধ্যে ফিলিপিন্সে এসেছে এফবিআই। খুব শিগগিরই ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হবে এবং অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। ‘এ তদন্ত ফিলিপিন্সের ব্যাংকগুলোর ভবিষ্যৎ ভাবমূর্তির উপরও প্রভাব রাখতে পারে,’ বলে মনে করছেন গোমেজ। সিনেট তদন্তে দোষ স্বীকার করলেও আরসিবিসি ব্যাংক ম্যানেজার সান্তোস দেগুইতো অপকর্মটি একাই করতে পারেন না মন্তব্য করে গোমেজ বলেন, আমি মনে করি না বিশ্বের কোনো ব্যাংক ম্যানেজারই হঠাৎ করে কিছু অ্যাকাউন্টে আসা লাখ লাখ ডলার এভাবে নগদে দিয়ে দিতে পারেন। আমি মনে করি না বিশ্বের কোথাও কোনো ব্যাংকের সিইও বা প্রেসিডেন্ট একজন ম্যানেজারকে এতো বড় অঙ্কের অর্থ নিয়ে কাজ করতে দেবেন।

Print
833 মোট পাঠক সংখ্যা 1 আজকের পাঠক সংখ্যা

About admin

Close