ভিকটিম ব্লেইমিং

এক্সপ্রেস ডেস্ক:তসলিমা নাসরিন: ভিকটিম ব্লেইমিং এর অভ্যেসটা মানুষের অনেক কালের। সম্ভবত ইতিহাসের শুরু থেকে। ভিকটিমদের দোষ দিয়ে মানুষ অভ্যস্ত। যখন রাজা-বাদশাহরা মানুষদের ফাঁসিতে ঝোলাতো, যখন শূলে চড়াতো, মানুষ ঘৃণা ছুড়তো, গালি ছুড়তো, ঢিল ছুঁড়তো ভিকটিমদের উদ্দেশে। শাস্তি যে পাচ্ছে সে কী অপরাধ করেছে, আর সেই অপরাধের শাস্তি কী হওয়া উচিত—এগুলো ভাবা, বিচার করা কঠিন। মানুষ কঠিন ব্যাপারের মধ্যে যেতে চায় না। সহজ জিনিস লুফে নেয়। যে যাকেই যে কারণেই শাস্তি দিক, সেই শাস্তি  বিচার বিবেচনা করেই দেওয়া হয়েছে, অধিকাংশ মানুষই তা ভেবে নেয় এবং শাস্তিকে সমর্থন জানায়।
একবিংশ শতাব্দী চলছে। এখনও মেয়েরা ধর্ষিতা হলে  মানুষ ধর্ষিতাকেই দোষ দেয়। এ কারণে এখনও ধর্ষিতাকে মুখ লুকোতে হয়  ভয়ে আর লজ্জায়। অধিকাংশ মানুষ এখনও বলে‘নিশ্চয়ই মেয়েটির সাজপোশাকে, আচার ব্যবহারে যৌন সম্পর্কের জন্য আহবান ছিল’। এত যে চারদিকে নারীবাদীরা বলছেন,‘ধর্ষণের জন্য দায়ী ধর্ষকরা, ধর্ষিতা নয়, ভিকটিম ব্লেইমিং বন্ধ করো’। তাতে কাজ হচ্ছে না খুব। খুব অল্প কিছু মানুষের মানসিকতায় পরিবর্তন এসেছে। বাকি অধিকাংশই এখনও ধর্ষণের দোষ এবং দায় ধর্ষিতাকেই দেয়। বাংলাদেশে লেখক-বুদ্ধিজীবী হত্যা চলছে। মুক্তচিন্তার মানুষকে তো টার্গেট করাই হচ্ছে। সংস্কৃতমনা মানুষও বাদ পড়ছেন না। মুসলমান-অমুসলমান কাউকে রেহাই দেওয়া হচ্ছে না। ফেসবুকে লিখলে,  গান গাইলে, সেতার বাজালে, কবিতা লিখলে, কবিতা পত্রিকা ছাপালেও মেরে ফেলা হচ্ছে। সমকামী উভকামী কারও রেহাই নেই। বোরখা নিয়ে দুটো শব্দ উচ্চারণ করলেই কোপ। হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ নেই দেশ জুড়ে। দেশ যেমন চলছিল তেমনই চলছে। যেন কিছুই ঘটেনি। যেন কেউ কাউকে কুপিয়ে হত্যা করেনি। অথবা হত্যা করলেই বা কী! কেউ খুন হলেই মানুষ আজকাল ধারণা করে নেয়, লোকটা নাস্তিক ছিল। নাস্তিক ছিল বলেই খুন করা হয়েছে। তা না হলে তাকে খুন করা হবে কেন। শাস্তি যেই দিক, যারাই দিক, তাদের বিচারকেই সঠিক বিচার বলে মেনে নেয় অধিকাংশ মানুষ। যে লোকটিকে  শাস্তি দেওয়া হয়েছে, সে নিরপরাধ ছিল, এবং যে শাস্তি দিয়েছে, অন্যায়টা তার — এই ভাবনা খুব কম মানুষের মাথায় আসে। সম্ভবত ভাবনাটি জটিল বলে। সম্ভবত এই ভাবনার সঙ্গে আরও ভাবনা জড়িত বলে। যেমন এই লোকটি নিরপরাধ হলে কী কারণে তাকে খুন হতে হলো, যারা খুন করলো, তারা কেনই বা খুন করবে তাকে, আর এ ক্ষেত্রে খুন করে খুনীদের কী লাভ… এসব ভাবনা সহজ নয়। জটিল ভাবনা মানুষ ভাবতে চায় না। সহজ অংক কষতে সকলে চায়, জটিল অংক নয়।  রাস্তায় পকেটমার পেলে সবাই মারে। কেউ কাউকে মারছে দেখলে মানুষের হাত নিশপিশ করে আরও মারার জন্য। মার বন্ধ করতে যত মানুষ এগোয়, তার চেয়ে বেশি এগোয় মারে অংশ নিতে। কেন মারছে পকেটমারকে, পকেটমার কতটুকু কী অন্যায় করেছিল, কত টাকা কার পকেট থেকে নিয়েছে, কী কারণে নিয়েছে, আদৌ এ পকেটমার কী না, নাকি এ পকেটমার নয়,  একে পকেটমার বলে শুধু ধারণা করা  হচ্ছে— এসব গবেষণার সময় কোথায় মানুষের! এসব জটিল জিনিস। তার চেয়ে ‘সবাই মারছে যখন তুমিও মারো। মারলে তো কোনও অসুবিধে নেই। জেল জরিমানা হবে না। যে লোকটি মারার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, নিশ্চয়ই ঠিকই নিয়েছিল।  নিশ্চয়ই সে ভালো বিচারক’। লোকটি কে লোকটির চরিত্র কেমন ইত্যাদি না জেনে মানুষ সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় সে ভালো বিচারক। বিচারে ভুল হতে পারে, এই সংশয়টি কারও ধারে কাছে ঘেসে না।  মানুষ যে কাউকেই বিচারক হিসেবে মেনে নেয়। সুপ্রিম কোর্টের বিচারকও বিচারক। পকেটমারের গায়ে প্রথম যে হাত তুলেছিল, সেও বিচারক। প্রগতির পক্ষের মানুষকে যে জিহাদিরা নির্বিঘ্নে কুপিয়ে মারছে, সেই জিহাদিরাও বিচারক। যে স্বামী স্ত্রীকে পেটাচ্ছে, তাকেও ভেবে নেওয়া হচ্ছে বিচারক। স্ত্রীর নিশ্চয়ই কোনও দোষ ছিল। নিশ্চয়ই প্রগতির পক্ষের মানুষের  কোনও দোষ ছিল। নিশ্চয়ই ছেলেটি পকেট মেরেছিল কারও। ভিকটিমদের দোষ দিতে দিতে অভ্যেস আমাদের এতই নষ্ট হয়েছে যে লেখক বুদ্ধিজীবীদের নৃশংসভাবে হত্যা করলেও আমরা লেখক বুদ্ধিজীবীদের দোষ দিই। ধর্ষণের জন্য, ভায়োলেন্সের জন্য, খুনের জন্য আমরা খুনীকে বা ধর্ষককে বা সন্ত্রাসীকে দোষ দিই না। পুরো বিশ্ব জানে বাংলাদেশে নাস্তিকদের কুপিয়ে মারছে ইসলামী সন্ত্রাসীরা। এখন কোনও আস্তিককে মেরে ফেলা হলেও বলা হবে, ও ব্যাটা নির্ঘাত নাস্তিক ছিল।  হত্যাকারীদের, আক্রমণকারীদের, ঘৃণাকারীদের বিচারের ওপর মানুষের আস্থা অসম্ভব বেশি। তাদের বিচার আর আদালতের বিচারের মধ্যে মানুষ পার্থক্য দেখে না। ‘ওকে যখন খুন করা হয়েছে, খুনের পেছনে নিশ্চয়ই কোনও কারণ আছে। কারণ না থাকলে ওরা খুন করবে কেন!’  সন্ত্রাসী আর খুনীদের প্রতি মানুষের আস্থা এবং বিশ্বাস দিন দিন বাড়ছে, আর ভিকটিমদের প্রতি মানুষের ঘৃণা এবং অবিশ্বাসও দিন দিন বাড়ছে।

Print
878 মোট পাঠক সংখ্যা 1 আজকের পাঠক সংখ্যা

About admin

Close