বিশ্বজিৎ চৌধুরীর গল্প || মধুমালতী ডাকে আয়

এক্সপ্রেস ডেস্ক: একদিন এট্টু খাসির মাংস খাওয়াইতে পারিস বাপ? শুনে চমকে উঠেছিল গোবিন্দ। তারপরই সেই বিস্ময় রূপান্তরিত হয়েছে রাগে। খেঁকিয়ে উঠেছে সে, আত্কা তোমার খাসির মাংসের কথা মনে পড়ল ক্যান? বেধবা মেয়ে মানুষ গুপনে মাছ-টাছ খাও জানি, এইবার খাসির মাংসের লুভ অইল? এত লুভ তোমার? ছেলের কথায় লজ্জা পেল বোধহয় রেবতীবালা, নিচু স্বরে বলল, ঠিকই কইছস বাবা, লুভ লুভ, বয়স যত বাড়ে লুভও বাড়ে য্যান…। ভগমান মরণও দেয় না, লুভও আমারে ছাড়ে না। বয়স বাড়লে যে মানুষ শিশুর মতো হয়ে যায় একথা এই রেবতীবালাকে দেখে দিনে দিনে বুঝতে পারছে গোবিন্দ। ছেলের কাছে মাঝে মাঝেই এটা ওটা আবদার করছে আজকাল। জানে এসব আবদার পূরণ হওয়ার নয়, তবু ছেলেটাকে একটু কাছে পেলেই এটা ওটা বায়না করে মেজাজটা খারাপ করে দেয় তার, দুচারটা শক্ত-মন্দ কথা শুনে তারপর চুপ মেরে যায়।গোবিন্দ স্নান সেরে এসে চুল-টুল আঁচড়ে আধময়লা ফতুয়া আর পাজামাটা পরে বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। বাইরে আর কী, বাজারে সেনবাবুর চায়ের দোকানে গিয়ে বসা, সারা দিনে এককাপ চা খেয়ে, বাবুর ছেলের ভ্রু কুঞ্চিত বিরক্ত চেহারার সামনে বসে থাকা। কোনো কোনোদিন দোকানে খদ্দের বেশি হলে বাইরে রাখা বেঞ্চিতে গিয়ে বসে, সেখানে বসে বিড়ি ফোঁকে।

অপেক্ষা তাকে করতেই হয়, খেপের অপেক্ষা। অবস্থা খুবই খারাপ। দু’তিন দিনে মিলে একটা খেপ আসে না। এলেও টাকা-পয়সা নিয়ে এমন দরাদরি, শালার গান গাইলে লোকটার যে ভাতও খেতে হয় এই লোকগুলো যেন ভুলে বসে আছে। এখন আর আগের মতো ডিমান্ড নেই গোবিন্দ মহাজনের। আগে আশপাশের দু’চার গ্রামজুড়ে মোটামুটি একটা নাম ছিল। কীর্তনের দল যেখান থেকেই আসুক, গোবিন্দ মহাজনের ভক্তিমূলক গানের জন্য আসরের সবারই আগ্রহ ছিল। শুধু কীর্তন কেন, বিয়ের অনুষ্ঠান বা মুসলিমদের গায়ে হলুদেও কী ডাক পড়তো না। যেখানে যেমন, ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যেমন মীরার ভজন, রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলার বিবরণ গেয়ে আসর জমিয়ে দিত, তেমনি বিয়ে বাড়ি বা গায়ে হলুদে কিশোর কুমার-হেমন্ত-মান্না, লতা-আশা এমনকি শ্যাম-শেফালীর গান গেয়ে বাহবা পেতো সকলের। শিল্পীর সম্মানী তখনো তেমন ছিল না, কিন্তু সম্মান কিছুটা ছিল। এখন টাকাও নেই সম্মানও নেই। তখন প্রতিদিনই মোটামুটি কোনো না কোনো অনুষ্ঠানে ডাক পড়ত বলে মোটামুটি দিন চলে যেত, এখন যায় না। ডিমান্ড কমে গেছে। কীর্তনের আসর তো প্রায় বসেই না। আশপাশের গ্রাম মিলে সারা মাসে বড় জোর দু’পাঁচটা। সবকটাতে কি আর গোবিন্দের ডাক আসে? আর বিয়ে, গায়ে-হলুদের অনুষ্ঠানে শহর থেকে শিল্পী আসে, কি-বোর্ড আর ভারী ভারী সাউন্ড বক্স আসে। কী যে গায় সেই শিল্পীরা, শুধু যন্ত্রের শব্দ, গলা আর শোনা যায় না। কিন্তু গোবিন্দ এ রকম মনে করলে কী হবে, ভুলভাল সুরে গানের সঙ্গে যন্ত্রের দাপাদাপি তো পাবলিকে খায়, এটাকেই বলে ডিমান্ড। এসব আসরে ডাক পড়লে লোকজন জড়ো হওয়ার আগে দু’চারটে গান গাওয়ার সুযোগ পায় গোবিন্দ, দু’চারশ টাকা গুঁজে দিয়ে তাকে বিদায় করে দেওয়ার পর রাত বাড়লে শুরু হয় আসল ডিমান্ডের গান। সেই শিল্পীরা হাজারের ওপর টাকা পায়। প্রথম প্রথম খুব অভিমান হতো, এত লোকের খাবারের ব্যবস্থা সেখানে, কেউ এক বেলা খেয়ে যেতেও বলে না। এই তোমার মূল্য গোবিন্দ? এর নাম শিল্পীর সম্মান!

শাক-লতা, কচু-ঘেঁচু খেয়ে দিন যায়, কখনো ভাগায় সস্তা পেলে পুঁটি বা মলা মাছের ঝোল হয়ে যায়। এর মধ্যে বুড়ি যে কী করে ছেলের কাছে হঠাৎ খাসির মাংস খাওয়ার আবদার করার ভরসা পেল ভেবে পায় না গোবিন্দ। খেঁকিয়ে উঠেছে বটে, বুড়ির কথা শুনে নিজের মনেও কেন জানি একবার খাসির মাংসের স্বাদ মনে পড়ে গেল গোবিন্দের। কত আগে, কতদিন আগে যে খেয়েছিল! এখনো সেই স্বাদ মনে পড়লে জিহ্বাসহ পুরো মুখটা লোলরসে সিক্ত হয়ে যায়। বুড়ি বলেছিল, লুভ লুভ…। সেই লোভ এখন নিজের ভেতরও টের পায় যেন। ভেজা চুলে টেরি কেটে সেই যে সকাল থেকে সেনবাবুর দোকানে এসে বসে থাকে কেউ এসে বায়না করে যাবে বলে, সেই নিয়ম চলতেই থাকে। একটা মোবাইল ফোন থাকলেও হতো, আজকাল কে আর এত দূর এসে তার মতো শিল্পীর সঙ্গে বায়না করতে চায়। অনেকে বলে, সেই দিন একটা প্রোগ্রাম ছিল গোবিন্দ, তোমারে তো ফোনেও পাওয়া যায় না… একটা মোবাইল নিতে পার না?

নিব, মোবাইল একটা নিয়া নিব এইবার…।

বলে বটে, সে নিজেও জানে এই যন্ত্রটা কেনা আর তার বিলের বাড়তি বোঝা নেওয়ার সামর্থ্য তার নেই। যখন হবে তখন হবে, আপাতত সেনবাবুর দোকানে চাতক পাখির মতো দু’ ফোটা বৃষ্টির জন্য বসে থাকা ছাড়া গতি নেই।

সেনবাবুর দোকানে বসে থাকার অন্য একটি ব্যক্তিগত সুখ আছে। দুপুরের দিকে এই পথ দিয়ে বাড়ি ফিরে যায় মালতী। প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকা মালতী চলতি পথে একবার সেনবাবুর দোকানের দিকে তাকাবেই। একবার চোখাচোখি হয়ে যায়, এইটুকু সুখ। কদাচিৎ ভিড়বাট্টা কম থাকলে দু’একটা কথাও হয়। সেই কথার অদ্ভুত অনুরণন হয় বুকের ভেতর। তখন গোবিন্দ গুন গুন করে গান করে। কেউ অবশ্য জিজ্ঞেস করে না, কী ব্যাপার গোবিন্দ? মনে খুব আনন্দ মনে অয়, গান করতেছো। জিজ্ঞেস করে না, কারণ গোবিন্দ তো শিল্পী, গানের সুর যখন তখন সে একটু ভাজতেই পারে মনে মনে।

কেমন আছো গোবিন্দদা? – কয়েকদিন আগে জিজ্ঞেস করেছে মালতী।

আছি, কুন রকম আছি। তুমি কেমন আছ মালতী?

আমি তো ভালোই আছি, তুমি কেমন এট্টু শুকায়া গেছ মনে অয়…।

উত্তর না দিয়ে ম্লান হাসে গোবিন্দ।

রেবতীমাসি কেমন আছে? কতদিন দেখি না মাসিরে…।

কি অইব মাসিরে দেইখ্যা?

কি অইব মানে, মাসি আমারে কত ভালোবাসত….।

গোবিন্দ হেসে বলে, ভালোবাসত তো অন্য কারণে, মনে মনে ভাবত এই মাইয়া তো আমার ছেলের বউ হবে। এখন তো আর…।

সবাইরে নিজের মতো স্বার্থপর মনে কইরো না গোবিন্দদা, মাসি আমারে ভালোবাসে এহনও, কয়েক মাস আগে একবার গেছিলাম ওই বাড়িতে, আমারে দেইখা জড়ায়া ধরল…।

গোবিন্দর হাসি পায়, আমি স্বার্থপর? আমি কী চাইলে তোরে আর আগের মতো জড়ায়া ধরতে পারব রে মালতী?- এ কথা ভেবে মনে মনে হাসে, মনের সেই ভাব কি মুখ ফুটেও বেরোল? মালতী বলে, কী অইল হাসলা যে…।

না, এমনি হাসি।

ছবির মতো গ্রাম আরশিছড়ি। কিনারা ঘেঁষে আরশি খাল বয়ে যায় বলে তার সাথে নাম মিলিয়ে গ্রামের নাম। সেখানে হিন্দুপাড়ায় বারো ঘর এক উঠোনের বাড়ি। পাশাপাশি দুই ঘরের বাসিন্দা ছিল গোবিন্দ আর মালতী। এত কাছাকাছি থেকে গোবিন্দর মতো এক তরুণ গায়কের প্রেমে পড়বে না কিশোরী মালতী!

তবে প্রেমে না পড়লেও বোধহয় পারত মালতী। ওর মতো এমন সুন্দর চেহারার মেয়ে বারো ঘরে তো বটেই, পুরো গ্রামেই ছিল না আর। এ তল্লাটের জন্য দুর্লভ ফর্সা গায়ের রঙ, পান পাতার মতো মুখ, এমন ছিপছিপে শরীরের গড়ন নিয়ে বেড়ে উঠছিল এ মেয়ে, তাতে মা-বাবার বুক যেমন কেঁপে ওঠে আশঙ্কায়, আবার বড় কোনো ঘরে নির্ঘাৎ যে তার সম্বন্ধ আসবে এই সম্ভাবনাও জেগে ওঠে।

মালতী প্রেমে পড়ছিল কারণ গ্রামে সময়-অসময়ে কোকিল ডাকে, কাঁঠালচাঁপা-হাসনাহেনার গন্ধে পাঠে মন বসে না, রাতে ঘুম আসে না, দিনে স্নান করতে গিয়ে পুকুরঘাটে রমণীরা আদিরসের কথায় হেসে গড়িয়ে পড়ে এ ওর গায়ে- এত সব প্ররোচণা মুখ বুঁজে সহ্য করবে এত মনের শক্তি কোথায় পাবে সে।

হরিপদ মহাজনের ছেলেটা পড়াশোনায় তো ছিল লবডঙ্কা, সকালবেলা থেকে শুধু হারমোনিয়াম বাজিয়ে গলা সাধত। এসব গান-বাজনা দিয়ে কী ঘণ্টা হবে! কিন্তু পড়তে বসে যে মন ছুটে যেত মালতীর! ঘরের কাজেও তেমন মনোযোগ ছিল না। এ জন্য লাঞ্ছনা-গঞ্জনা কম তো জোটেনি, কিন্তু গোবিন্দদা ‘মধুমালতী ডাকে আয়’ গেয়ে উঠলে ভরা বর্ষার খালের মতো খলবলিয়ে উঠত শরীর মন।

বাবা বেঁচে ছিল বলে মেট্রিকটা পাস করতে হয়েছিল বাধ্য হয়ে। বাপ ছিল ইউপি চেয়ারম্যানের অফিসের কেরানি। একমাত্র ছেলেকে শিক্ষিত করে শহরে সরকারি অফিসে চাকরি করতে পাঠাবে এই বাসনা ছিল মনে। কিন্তু এই ছোট স্বপ্নে মন ভরেনি ছেলের, স্কুলের ফাংশনে গান গেয়ে সেই যে একবার পুরস্কার পেয়েছিল, তখন থেকেই মনে মনে কিশোর কুমার হয়ে বসে আছে। তা ছাড়া নিজের গ্রামে, আশপাশের গ্রামে গান গেয়ে দু-দশ, বিশ টাকা পেতে শুরু করেছিল তখন থেকেই, তাতে মনে হয়েছিল একদিন দেশজোড়া নাম করবে সে। দেশটা যে আসলে কত বড় আরশিছড়িতে বসে কী আর বোঝা যায়? বোঝা যায় না বলেই বাপটা মারা যাওয়ার পর শ্মশানে তার মৃতদেহের সঙ্গে ছেলেটাকে নিয়ে তার যাবতীয় স্বপ্নও পুড়িয়ে দিয়ে এসেছিল গোবিন্দ।

মালতী কিন্তু ঠিকই দু’বছর পর মেট্রিক পাস করে একটু দূরে শহরতলীর একটা কলেজে ভর্তি হয়েছিল। তখন বাড়ির লোকজনের চোখ বাঁচিয়ে দুজনের দেখা সাক্ষাতের সুযোগটা হয়ে গিয়েছিল। কলেজ ফাঁকি দিয়ে গোবিন্দের সঙ্গে এখানে ওখানে চলে যেত। নির্জন রেলস্টেশনের পাশে পড়ে থাকা ভাঙাচোরা ট্রেনের বগিতে ঢুকে এক আধটু জড়িয়ে ধরা, চুমুটুমু খাওয়াও হতো।

কিন্তু কী করে যেন ঠিক সময়ে আইএ পরীক্ষায় পাস করে ফেলেছিল মেয়েটা। মালতীর যখন বিয়ে ঠিক হয়েছিল তখন ওর মার কাছে একবার আমতা আমতা করে নিজের ছেলের কথা বলতে গিয়েছিল রেবতী। এরকম একটি অবাস্তব প্রস্তাবের জন্য যথেষ্ট হেনস্তাও হয়েছিল। কিন্তু মালতীর তো তখনো গানের ঘোর কাটেনি, একদিন এসে বলেছিল, আমারে নিয়া পালায়া যেতে পারবা না গোবিন্দদা?

গোবিন্দ পালাবে মালতীর সঙ্গে? নিজের কোনো ঠিক-ঠিকানা নাই, গান গেয়ে আজ কিছু টাকা পাওয়া যায় তো পরের পনেরো দিন হাত খালি। ‘চেয়ে চেয়ে দেখলাম তুমি চলে গেলে…’ ধরনের গানগুলি কী আর এমনি এমনি রচিত হয়েছে!

মালতীর বিয়ে হয়েছিল একই গ্রামের এক স্বচ্ছল অবস্থাপন্ন পরিবারে। স্বামী শিক্ষিত, শহরে ভূমি রেজিস্ট্রি অফিসে চাকরি করে।

তোমার স্বামীটা লোক কেমুন?- বিয়ের বছর দুয়েক পর একবার জিজ্ঞেস করেছিল গোবিন্দ।

বললে বিশ্বাস করবে না গোবিন্দদা, এই রকম একটা ভালা মানুষ হাজারে মিলবে না।

অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল ওর মুখের দিকে।

মালতী নিজেই আবার বলল, আমার পোলাপান হয় না। তবু কোনোদিন এট্টু মনখারাপ করতে দেখলাম না, বলে যে ভগমান যদি না চায় কেমনে অইব? … না হলে নাই।

শালার নিজের দোষেই হয় না… ভালা মানুষি দেহায়!- রাগ সামলাতে না পেরে বলে উঠেছিল গোবিন্দ।

ফোঁস করে উঠেছিল মালতী, তুমি কেমনে জানলা যে ওর দোষে হয় না? তোমার মনে হিংসা গোবিন্দদা, তাই লোকটারে নিয়া এরকম কথা বলতে পারলা।

কথা ঠিক, কোনো মেয়েকে স্বামী সম্পর্কে এরকম কথা বললে তার সহ্য হওয়ার কথা না। গোবিন্দ বুঝতে পেরেছিল। বুঝতে পেয়ে বুকের ভেতর একটা চিনচিন ব্যথা টের পেয়েছে।

তবু প্রাইমারি স্কুলের দিদিমণি মালতী স্কুল থেকে ফেরার পথে একবার সেনবাবুর দোকানের দিকে তাকায়। চোখাচোখি হয়ে যায়। কখনো সখনো একটু এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে ডাকেও, দু’একটি কথা হয়, সেটাইবা কম কী!

দিন তো চলেই যাচ্ছিল। সংসারটা মাত্র দুজনের, যত অর্থকষ্টই হোক টেনেটুনে পার করা যায়। ঘরে একটা বউ আনতে পারল না বলে রেবতীবালার মনে আক্ষেপ মাঝে মাঝে চাড়া দিয়ে উঠত, এক-আধটু কাঁদুনিও গাইত এই দুঃখে। কিন্তু ছেলের মুখ ঝামটা খেয়ে আবার চুপ মেরেও যেত।

সেই রেবতী একদিন ভোরের দিকে দুম্ করে মরে গেল। বলা যায়, তেমন কোনো অসুখ-বিসুখ ছাড়াই নীরবে জীবন থেকে সরে গেল মহিলা। ডাক্তার-ওষুধ নিয়ে ছুটোছুটি করতে হলো না- এটা বড় একটা বাঁচোয়া। কিন্তু জীবনে যে মহিলার উপস্থিতি প্রায় অগ্রাহ্য করেই গেল গোবিন্দ, তার মৃত্যু কেন যেন একটা সর্বস্বান্তের বোধ তৈরি করে দিল তার মনে। একটা সুতো ছেঁড়া ঘুড়ি হাওয়ায় ভেসে বিলের পর বিল পেরিয়ে উড়ে যাচ্ছে নিরুদ্দেশের টানে- এমন একটা অনুভব।

জন্ম-মৃত্যু-বিবাহ এসব নিয়ে হিন্দুদের একশ একটা নিয়ম আছে। নিয়ম যে মানে তার জন্য আছে, যার মানার সামর্থ্য নেই তার জন্য নেই। দিন-পনেরো পর যেনতেন ভাবে শ্রাদ্ধ-শান্তি সেরে ফেলার পর শুভাকাঙ্ক্ষীরা এক ব্রাহ্মণ নেহায়েত গায়ে পড়ে বললেন, বাপ রে, মায়ের লাইগা কিছুই তো করলা না, পইচ্যার ভাতটা পারলে দিও।

‘পইচ্যার ভাত’ মানে হলো মৃত ব্যক্তির উদ্দেশে ভাত-তরিতরকারি সাজিয়ে শ্মশানখোলা বা পুকুরঘাটের এক প্রান্তে রেখে আসা। কুকুর বেড়াল বা কাক এসে এসব খেয়ে যায়, মানুষের ধারণা, মৃতব্যক্তির আত্মা এসে খেয়ে গেল। তাই তার পছন্দের খাবার সাজিয়ে রাখা হয়। অদ্ভুত সব বিশ্বাস!

গোবিন্দ মোটেই বিশ্বাস করে না। তবু এই নিয়মটা রক্ষা করতে হবে। কিন্তু সমস্যা হলো রেবতীবালা শেষ জীবনে চেয়েছিল একটু খাসির মাংস খেতে। এই খাসির মাংসের ব্যবস্থা কোত্থেকে করবে সে।

শ্রাদ্ধের দিন মালতী এসেছিল বাড়িতে। খুব কান্নাকাটি করল। শুধু বুড়ির জন্যই এত কাঁদল, নাকি তার ছেলেটার জন্যও কিছুটা, গোবিন্দ ভেবে পায় না। মালতী বলল, মাসির জন্য তুমি পইচ্যার ভাত দাও গোবিন্দদা, আমি রেঁধে দেব।

ওর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মিনমিন করে বলেছে, বুড়ি ক’দিন ধরে খুব খাসির মাংস খাওনের বায়না ধরছিল।

আমি রেঁধে আনব, আইজ বিকালেই রেঁধে আনব।

বিকেলের দিকে ঠিকই ভাত তরকারি খাসির মাংস রেঁধে এনেছে মালতী। একটা সানকির ওপর কলাপাতায় সব সাজিয়ে দিয়ে বলেছে, যাও পেছন পুকুরের পারে রেখে আসো… ভক্তিভরে রেখে আসবা মায়ের জন্য, ঠিক আছে?

মাথা নেড়ে সেই পইচ্যার ভাত নিয়ে একা পুকুরের পেছন দিকটায় গিয়েছে গোবিন্দ। ‘ভক্তি ভরে’ রেখেছেও একপাশে। একটু পরেই কুকুর বা বেড়াল এসে রেবতীবালার আত্মার পক্ষ থেকে এসব খেয়ে যাবে।

ফিরে আসছিল। হঠাৎ খাসির মাংসটার গন্ধটা গোলমাল করে দিল সবকিছু। গন্ধটা নাকে লাগতেই কী রকম এলোমেলো হয়ে গেল মনটা। রেবতীবালার আত্মা কী ভর করলো তার ছেলের ওপর! চারপাশে একবার তাকিয়ে মায়ের জন্য দেওয়া পইচ্যার ভাত তুলে নিয়ে নিজেই গোগ্রাসে খেতে শুরু করল গোবিন্দ। পাপ, কত বড় পাপ! আবার ভাবল, কিসের পাপ? আত্মার নাম করে শেয়াল কুকুরে খাবে!

কতদিন পর, কতদিন পর খাসির মাংস দিয়ে সরু চালের ভাত। ছেলের এমন তৃপ্তি দেখে মায়ের আত্মা শান্তি পাবে না!

খাওয়াটা প্রায় শেষ করে এনেছে, ঠিক এ সময় হঠাৎ চমকে উঠল। তার দিকে তাকিয়ে আছে মালতী। মেয়েটা কখন এসে পড়ল পুকুরের এ দিকটায়? ক্ষুধায়, লোভে হুঁশ হারিয়েছিল গোবিন্দ, নইলে…। এবার মালতীর দিকে তাকিয়ে লজ্জায় মাথা নিচু হয়ে যায় তার।

ব্যথা ও বিস্ময়ের কণ্ঠে মালতী ডাকল, গোবিন্দদা…।

লজ্জা ও ভয়ে চোখ তুলে তাকাল সে।

আশ্চর্য, মেয়েটার চোখে কোনো ক্রোধ নেই। শুধু কী এক করুণায় চোখের জলে চোখ ভেসে যাচ্ছে তার!

Print
437 মোট পাঠক সংখ্যা 1 আজকের পাঠক সংখ্যা

About admin

Close