পাকিস্তানে পালিয়ে বিয়ে করায় মেয়েকে পুড়িয়ে হত্যা করলেন মা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: পাকিস্তানে পরিবারের অসম্মতিতে পালিয়ে বিয়ে করায় নিজের মেয়েকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করেছেন এক মা। বুধবার লাহোর থেকে ওই মাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।  এ ঘটনার পর পুনরায় পাকিস্তানে অনার কিলিং নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে। পুলিশ জানায়, এক সপ্তাহ আগে আদালতে গিয়ে পছন্দের ছেলে হাসান খানকে বিয়ে করেন জিনাত রফিক। পরে তার বাবা-মা জিনাতের স্বামীর বাড়িতে যান। জিনাতকে তারা প্রতিশ্রুতি দেন, ধর্মীয় ও পারিবারিক আইন মেনে আবার তাদের বিয়ে দেওয়া হবে। এ লোভ দিয়ে জিনাতকে তাদের সঙ্গে নিয়ে আসেন। পুলিশ আরও জানায়, জিনাত রফিকের দেহে নির্যাতনের আলামত পাওয়া গেছে। তাকে বিছানার সঙ্গে বেঁধে ডিজেল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। এতে তার মৃত্যু হয়।  হত্যার বিষয়টি তদন্ত করছে পুলিশ। স্থানীয় পুলিশের সুপার (এসপি) ইবাদত নাসের জানিয়েছেন, তারা নিহত জিনাত রফিকের ভাইকে খুঁজছেন। ঘটনার পর থেকে পালিয়ে রয়েছে। জিনাতের মা পারভিন খুনের কথা স্বীকার করেছেন।  নিহতের স্বামী হাসান জানান, জিনাত যখন তার পরিবারকে তাদের বিয়ের কথা জানান তখনই তার পরিবারের সদস্যরা নির্যাতন করা শুরু করে। এতে তার মুখ ও নাক দিয়ে রক্ত বেরোতে থাকে। এদিকে গ্রেফতারের পর পুলিশের কাছে নিজ কন্যাকে পুড়িয়ে খুন করার কথা স্বীকার করেছেন ৫০ বছরের পারভীন। নিহত ওই কিশোরীর নাম জিনাত রফিক। পুলিশ জানিয়েছে, ১৮ বছরের জিনাতের শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছ। তবে, তার গায়ে আগুন ধরানোর সময় পর্যন্ত তিনি বেঁচে ছিলেন কিনা তা খতিয়ে দেখতে ময়নাতদন্ত করা হবে। পাকিস্তানে অবশ্য এ ধরনের হত্যাকাণ্ড নতুন কিছু নয়। চলতি মাসেই বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ায় দেশটিতে এক তরুণীকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। দ্বিতীয়বারের মতো প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ায় হতভাগ্য ওই তরুণীকে এ নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হয়। মারিয়া সাদাকাত নামের ওই তরুণীকে কয়েকজন মিলে বেদম মারধরের পর গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এতে ১৯ বছরের ওই তরুণীর শরীরের ৮৫ শতাংশ পুড়ে যায়। পরে তাকে ইসলামাবাদ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে চিকিৎসাধীন ‍অবস্থায় ২ জুন তার মৃত্যু হয়। আসিয়া নামে ওই তরুণীর এক আত্মীয় জানান, স্থানীয় একটি স্কুলে শিক্ষকতা করতো সে। ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষকের ছেলের জন্য মারিয়াকে প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু ওই ছেলের দু’টি ডিভোর্স ও সন্তান থাকায় প্রস্তাবটি নাকচ করে দেওয়া হয়। এর প্রতিশোধ হিসেবে মেয়েটিকে আগুনে পুড়িয়ে মেরে ফেলা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন আত্মীয় আসিয়া। মেয়েটির ওপর অমানুষনিক নির্যাতন করা হয়েছে উল্লেখ করে মারিয়া সাদাকাতের চাচা আব্দুল বাসিত বলেন, ছেলেটির দু’বার ডিভোর্স হওয়ায় মেয়েটি বিয়ের প্রস্তাব নাকচ করে। এক পর্যায়ে মেয়েটি স্কুলের চাকরিও ছেড়ে দেয়।  এদিকে, মৃত্যুর আগে মেয়েটির লেখা একটি চিরকুট পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। যেখানে ঘটনার সঙ্গে স্কুলের অধ্যক্ষ ও আরো চারজন জড়িত বলে জানা গেছে। গত বছরের নভেম্বরে দেশটিতে সোনিয়া বিবি (২০) নামে এক তরুণীর ভাগ্যেও এমন নির্মম ঘটনা ঘটে। গত এপ্রিলে দেশটিতে এক সালিশের রায় অনুযায়ী ১৬ বছরের এক কিশোরীকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। অ্যাবোটাবাদের মাকল গ্রামে এ বর্বরোচিত ঘটনা ঘটে। অ্যাবোটাবাদের পুলিশ জানিয়েছে, মাকল গ্রামের কাউন্সিলর পারভেজের আহ্বানে ১৫ সদস্যের জিরগা (ইসলামের বিধান অনুযায়ী স্থানীয় বিচার ব্যবস্থা) ওই কিশোরীকে পুড়িয়ে হত্যার নির্দেশ দেয়। আম্বার নামের ওই কিশোরীর ‘অপরাধ’ ছিল, তিনি তার এক বান্ধবীকে নিজের ইচ্ছায় বিয়ে করার উদ্দেশে পালিয়ে যেতে সহায়তা করেছিলেন। এ বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড ও সালিশের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে  এরইমধ্যে ১৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে ঘটনার শিকার ওই কিশোরীর মা-ও রয়েছেন। গত ২৮ এপ্রিল ছয় ঘণ্টার সালিশ বৈঠক শেষে ওই কিশোরীকে তার বাড়ি থেকে একটি পরিত্যাক্ত ঘরে নিয়ে আসা হয়। সেখানে তাকে একটি পিকআপ ভ্যানে রাখা হয়। পরে ভ্যানটি পেট্রোল দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। এক পর্যায়ে পুলিশ ঘটনাস্থল সংলগ্ন এলাকা থেকে ওই তরুণীর দগ্ধ মৃতদেহের সন্ধান পায়। দগ্ধ ভ্যানটির পাশে আরেকটি ভ্যান রাখা ছিল। পরে ময়নাতদন্তের জন্য পুলিশ মৃতদেহটি আইয়ুব মেডিকেল কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়।পাকিস্তান তেহরিক ই ইনসাফ (পিটিআই) নেতা শওকত ইউসুফজাই ডনকে বলেন, এই বর্বর রায় যারা দিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যেটা ঘটেছে সেটা খাইবার পাখতুনখোয়া’র সংস্কৃতি নয়। এখানে এ ধরনের ঘটনা এটাই প্রথম ঘটেছে। পাকিস্তানের মানবাধিকার কমিশন জানায়, এ ধরনের ঘটনায় গত বছর দেশটিতে অন্তত এক হাজার একশ’ নারীর মৃত্যু হয়েছে। যদিও সঠিক তথ্য পেলে এ সংখ্যা আরও বেশি ঠেকবে। পাকিস্তান ও ভারতে পরিবারের অসম্মতিতে বিয়ে করলে তাদের শাস্তি পেতে হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মেয়েদের হত্যা করে তাদের পারিবার। বিষয়টিকে ‘অনার কিলিং’ বলা হয়। অনার কিলিংয়ের উদ্দেশ্য থাকে পরিবার ও বংশ পরম্পরার ঐতিহ্য রক্ষা করা। এসব রক্ষণশীল পরিবারে  নিজের পছন্দমতো ছেলেকে বিয়ে করা ‘পাপ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সূত্র: ডন, বিবিসি।

Print
913 মোট পাঠক সংখ্যা 1 আজকের পাঠক সংখ্যা

About Jessore Express

Close