জাতিসংঘের সেই শীর্ষ কর্মকর্তার পদত্যাগ, নেপথ্যে শান্তিরক্ষীদের যৌন হয়রানি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ফরাসি শান্তিরক্ষীদের দ্বারা মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে সংঘটিত যৌন নিপীড়নের ঘটনা ফাঁস করে দেওয়া সেই জাতিসংঘ কর্মকর্তা পদত্যাগ করেছেন। জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থায় কর্মরত এই কর্মকর্তা দাবি করেছেন, যৌন নিপীড়নকারীদের ‘পরিপূর্ণ দায়মুক্তি’ দেওয়া হয়েছে। একেই পদত্যাগের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি। এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি। পদত্যাগকারী ওই কর্মকর্তার নাম আন্দ্রেস কম্পাস। তিনি জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কার্যালয়ে ফিল্ড অপারেশনস বিভাগের পরিচালক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। আগামী অগাস্ট থেকে তার পদত্যাগ কার্যকর হবে বলে জানা গেছে। স্বাধীনভাবে অনুসন্ধান শেষে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীদের যৌন হয়রানি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে একটি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দল। ওই দলের সদস্য ছিলেন আন্দ্রেস কম্পাস। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে ফরাসি সেনা সদস্যদের বিরুদ্ধে ছেলেশিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও এক্ষেত্রে ব্যবস্থা নিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে জাতিসংঘ।

শিশু যৌন নিপীড়নের বিষয়টি প্রথম নজরে আসে ২০১৪ সালে। ২০১৩ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৪ সালের জুনের মধ্যে বাঙ্গুই বিমানবন্দরের কাছে ১০ শিশুকে যৌন নির্যাতন করা হয়। গৃহহীন লোকদের আশ্রয় দানকারী একটি শিবিরে ওই নিগৃহের ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, শিশুরা খাদ্যের জন্য সৈনিকদের কাছে আসলে তারা খাবার দেওয়ার বিনিময়ে তাদের সঙ্গে শারীরিক মিলন ঘটায়। নির্যাতিতের মধ্যে ৬ বছর বয়সী শিশুও রয়েছে। এ ঘটনা প্রকাশ পেলে ২০১৪ সালের জুলাইয়ে ফ্রান্স সরকারকে এ ব্যাপারে সতর্ক করে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা। যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে জাতিসংঘ ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হলে বিষয়টি নিয়ে ফরাসি কর্তৃপক্ষের কাছে একটি প্রতিবেদন জমা দেয় জাতিসংঘের কর্মী সুইডিশ নাগরিক আন্দ্রেস কম্পাস। গতবছরের জুনে জাতিসংঘের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনেও শান্তিরক্ষী বাহিনীর সদস্যদের যৌন নিপীড়নের বিষয়টি উঠে আসে। গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গো, লাইবেরিয়া, হাইতি, দক্ষিণ সুদানসহ বিভিন্ন আফ্রিকান রাষ্ট্রে এ ঘটনা ঘটছে বলে উল্লেখ করা হয়। ২০০৮ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে যৌন নির্যাতনের ৪৮০টি অভিযোগ পাওয়া গেছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

গৃহযুদ্ধবিধ্বস্ত আফ্রিকার এই দেশটিতে শান্তি রক্ষায় সহায়তা দিতে ২০১৪ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ৭০০ সেনা মোতায়েন করা হয়। সে বছর সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনী মোতায়েন করলে শান্তিরক্ষার দায়িত্ব ইইউর হাত থেকে জাতিসংঘের হাতে হস্তান্তর করা হয়। সেনা ও পুলিশসহ জাতিসংঘের এই মিশনে মোতায়েন করা শান্তিরক্ষীর সংখ্যা প্রায় ১৩ হাজার। ৫০টিরও বেশি দেশের সেনা ও পুলিশ সদস্য এই বাহিনীতে রয়েছেন। দেশটিতে একাধিক অনুসন্ধানে শান্তিরক্ষীদের হাতে শিশুদের যৌন হয়রানির বিষয়টি উঠে এসেছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে এ সংক্রান্ত এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন জাতিসংঘের অন্যতম সহকারী মহাসচিব এন্থনি ব্যানবারি। তিনি বলেন, জাতিসংঘের জন্য শান্তিরক্ষায় নিয়োজিত ব্যক্তিরা এমন জঘন্য কাজ করতে পারেন, তা ভাবা যায় না। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তোলার পর গত বছর আগস্টে মহাসচিব বান কি-মুন সেখানে জাতিসংঘ মিশনের প্রধান বাবাকার গাইয়ে-কে বরখাস্ত করেন। উল্লেখ্য, জাতিসংঘের নিয়ম অনুসারে, অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত শান্তিরক্ষী সেনা বা পুলিশ সদস্যকে যাঁর যাঁর দেশে বিচারের সম্মুখীন করার নিয়ম রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রেই শান্তিরক্ষী পাঠানো দেশগুলো যথাযথ বিচারের বদলে পুরো বিষয়টি ধামাচাপা দিয়ে থাকে। সূত্র: বিবিসি।

Print
1120 মোট পাঠক সংখ্যা 1 আজকের পাঠক সংখ্যা

About Jessore Express

Close