কাঠের সাঁকোয় ঝুঁকিপূর্ণ পারাপার, কেউ কথা রাখেনি

এক্সপ্রেস ডেস্ক: মণিরামপুরের হরিহর নদীর ওপর নির্মিত পাকা ব্রিজটি ভেঙেছে প্রায় আট বছর আগে। এরপর গ্রামবাসীর উদ্যোগে সেখানে কাঠের তৈরি সাঁকোর ওপর দিয়ে ঝুঁকি নিয়েই পারাপার দুই উপজেলার প্রায় ১৫ গ্রামের বিশ হাজার লোকের। সেটাও আবার মাঝে-মধ্যে ভেঙে পানিতে পড়ে আহত হতে হয় পথচারীদের। গত দুই বছরে এই সাঁকোর ওপর দুর্ঘটনায় একজনের মৃত্যুসহ আহত হয়েছেন প্রায় অর্ধশত। গেল শুক্রবার এক ভ্যানচালক ভ্যানসহ নিচে পড়ে গুরুতর আহত হন। এতোকিছুর পরও টনক নড়েনি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্টদের। সাঁকো ভাঙে আর স্থানীয়রা স্বেচ্ছাশ্রমে তা মেরামত করেন। দু’দিন আগে সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয় জনাদশেককে সাঁকোটি মেরামত করতে দেখা যায়। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যমতে, উপজেলার হরিহর নদীর ওপর ব্রিটিশ আমলের নির্মিত ফকিরের পাকা ব্রিজটি ছিল মণিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলার বাটভিলা, মুজগুন্নী, ইমাননগর, গড়ভাঙ্গা, দুর্বাডাঙ্গা, পাঁজিয়া, নাগোরঘোপ, চিনাটোলা, হাঁসাডাঙ্গা, মধ্যকুল, শ্যামকুড় ও আমিনপুর গ্রামের প্রায় ২০ হাজার লোকের সহজ পারাপারের একমাত্র অবলম্বন। প্রায় ২০ বছর আগে ব্রিজটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে । তবে আট বছর আগে ব্রিজটি আস্তে আস্তে ভেঙে নিচে পড়তে শুরু করে। দুই বছর আগে উপজেলার শ্যামনগরের এক কলেজশিক্ষক মোটরসাইকেল চালিয়ে পার হওয়ার সময় ব্রিজ ভেঙে নিচে পড়ে গুরুতর আহত হন। কয়েকদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর তিনি মারা যান। এর পর পরই ব্রিজটি ভেঙে নদীতে পড়ে যানবহনসহ জনচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে ৫-৭ মাস ব্রিজের দুই পাশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। তারপর স্থানীয়রা নিজ উদ্যোগে কাঠ দিয়ে নদীটির ওপর সাঁকো নির্মাণ করেন। এই সাঁকো নিয়মিত বিরতিতে ভাঙছে। এলাকাবাসী আবার তা মেরামত করছেন নিজেদের উদ্যোগ। সাঁকোর ওপর দিয়ে প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার মানুষ যাতায়াত করেন। বিশেষ করে রাতের অন্ধকারে এখান দিয়ে পারাপার খুবই ঝুঁকিপূর্ণ বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা। স্থানীয় হাফিজুর (২৫) নামে এক ভ্যানচালক বলেন, ‘গত শুক্রবার দুপুরে ইমাননগর গ্রামের ইসমাইল নামে এক ভ্যানচালক কাঠের সাঁকো ভেঙে ভ্যানসহ নিচে পড়ে গুরুতর আহত হয়েছেন। এছাড়া গত দুই বছরে পশু চিকিৎসক শফিকুল,  আবদুল জলিল, ভ্যানচালক সবিরুদ্দিন, শেখ জামালসহ অনেক লোক সাঁকো ভেঙে নিচে পড়েছেন।’ ৭৭ বছর বয়সী অনিল অধিকারী বলেন, ‘‘১০/১২ বছর আগে ব্রিজটি ভেঙেছে। সাবেক এমপি টিপু সুলতানকে বলেছি, ‘স্যার, আমাদের একটাই দাবি, ব্রিজটি দ্রুত করে দিতে হবে।’ তিনি দেবেন বলে দেননি। বর্তমান এমপি স্বপনবাবু ভোটের সময় এলাকায় এসে ব্রিজটির হাল দেখে বলেছিলেন, ‘পাস করলে এটা তৈরি করে দেব।’ নির্বাচনের কত বছর হলো, এখনো তিনি কথা রাখেননি।’’‘এখন আমরা সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, পাশের উপজেলা কেশবপুরের মন্ত্রীর কাছে গিয়ে আমাদের এই ব্রিজটির দাবি করব’, ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন অনিল অধিকারী। এদিকে, সম্প্রতি এক সকালে সাঁকোটির কাছে গিয়ে দেখা গেছে, স্থানীয় হাফিজুর, আশরাফুল, তাজাম্মুল ,মিন্টু, শরিয়তউল্যা, ইয়াসিন, রেজাউলসহ প্রায় ১০ ব্যক্তি কাঠ-বাঁশ নিয়ে আবার ভাঙা সাঁকোটি সংস্কারের চেষ্টা করছেন। এসময় সাংবাদিক দেখে রেগে গিয়ে রেজাউল বলেন, ‘জন্মের পর থেকে দেখছি মাপামাপি চলছে। কিন্তু আজো তা অফিস পর্যন্ত পৌঁছায়নি। আপনি যা করছেন তাও অফিস পর্যন্ত যাবে না।’একইভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করেন পথচারী চম্পা (৩০)। তিনি বলেন, ‘ছবি নিয়ে আর কী হবে? ছবি নিতে নিতে লোকজন কবরে যাবে। কিন্তু ব্রিজ হবে না।’স্থানীয় নাগোরঘোপ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মাওলানা জালাল উদ্দিন বলেন, ‘ওই পারের প্রায় ২৫০ শিক্ষার্থী সাঁকো পার হয়ে স্কুলে আসে। অনেকে বইখাতা নিয়ে নিচে পড়েও গেছে। কিন্তু ব্রিজ হলো না।’ তিনি দ্রুত ব্রিজটি নির্মাণের দাবি জানান। শ্যামকুড় ইউপি চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান মনি বলেন, ‘আমি ডিসি স্যারকে এনে সাঁকোটি দেখিয়েছি। তিনি এখানে নতুন করে ব্রিজ নির্মাণের আশ্বাস দিয়েছেন। পরে যোগাযোগ করলে তিনি জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে নাকি টাকা বরাদ্দও হয়েছে। আশা করছি দ্রুত ব্রিজটি হয়ে যাবে।’ মণিরামপুর থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য স্বপন ভট্টাচার্য্য বলেন, ‘ব্রিজটি নির্মাণের জন্য ইতিমধ্যে একটি জরিপ হয়েছে। এছাড়া এনজিওভিত্তিক একটি প্রজেক্টে ব্রিজটির নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং অনুমোদনও হয়ে গেছে।’  সংসদ সদস্যের আশা, চলতি অর্থবছরে ব্রিজটির টেন্ডার হয়ে যাবে।

Print
720 মোট পাঠক সংখ্যা 1 আজকের পাঠক সংখ্যা

About Jessore Express

Close