যশোরে নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে মর্গে ভিড়

এক্সপ্রেস ডেস্ক: লাল বানু আর জবেদা বেগম। খুবই সাধারণ গৃহবধূ। প্রয়োজন ছাড়া সচরাচর বাড়ি থেকে বের হন না। এই দুইজন বৃহস্পতিবার দুপুরে এসেছিলেন যশোর জেনারেল হাসপাতাল মর্গে। উদ্দেশ্য লাল বানুর ছেলে সোহেলের লাশ আছে কি-না দেখতে। যদিও সোহেল জীবিত কি মৃত তা জানা নেই তাদের। ছেলের লাশ নেই মর্গে। হয়তো এক ধরনের আশা- সোহেল বেঁচে আছে। তবু মায়ের মন মানে না। কাঁদতে কাঁদতে হাসপাতাল ছাড়েন লাল বানু। যশোর শহরের বেজপাড়া টিবি ক্লিনিক এলাকার বাসিন্দা ইংরেজে-লাল বানু দম্পতির সন্তান সোহেল (২৮)। ঝিকরগাছায় বসবাস করতেন তিনি। লাল বানু জানান, গত সোমবার ঝিকরগাছা থেকে নিখোঁজ হন সোহেল। এর পর থেকে তার কোনো সন্ধান নেই। ‘শুনলাম হাসপাতাল মর্গে চারটে লাশ আছে। ওর মদ্যি আমার সোহেল আছে কি-না দেখতি আইলাম’, অশ্রুসজল নয়নে বলছিলেন লাল বানু। দুদিন আগে এক রাতে ‘অজ্ঞাত’ চারটি লাশ পড়ে যশোরের দুই স্থানে। চলতি সপ্তাহে আরো বেশ কয়েকজন হতাহত হন কথিত বন্দুকযুদ্ধ বা গোলাগুলিতে। পুলিশ পরিচয়ে ধরে নেওয়া হয়েছে বেশ কয়েকজনকে। তাদের সন্ধান না মেলায় লাল বানুর মতো অনেক মানুষ প্রতিদিন ভিড় করছেন মর্গে। তারা পুলিশ-কর্তাদের কাছে যেতে সাহস পাচ্ছেন না। অন্য মাধ্যমে খোঁজ নিলেও পুলিশ জানিয়ে দিচ্ছে, অমুক নামে কেউ আটক আছে কি-না জানা নেই। ফলে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ছে নিখোঁজদের পরিবার-সদস্যদের মাঝে। হাসপাতাল চত্বরে লাশ খুঁজতে এসে তারা তার প্রকাশও ঘটাচ্ছেন। সোহেল নিখোঁজের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় ঝিকরগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোল্লা খবির আহমেদের কাছে। তিনি বলেন, ‘ওই নামে কেউ নিখোঁজ হয়েছে কি-না জানি। থানায় কেউ এমন অভিযোগ করেনি।’ সোহেল ছাড়াও গত কয়েকদিনে যশোরে যারা নিখোঁজ হয়েছেন, তাদের মধ্যে অন্তত তিনজনের নাম জানা গেছে। এরা হলেন সদর উপজেলার কামালপুর গ্রামের এরফান আলীর ছেলে শাজাহান আলী, শার্শা উপজেলার শিকড়ি গ্রামের নজরুল ইসলামের ছেলে শরিফুল ইসলাম (২৭) এবং মণিরামপুর উপজেলার কন্দর্পপুর গ্রামের আবু বক্কার দফাদারের ছেলে মহিদুল ইসলাম (২৭)। এদের মধ্যে শাজাহান আলী জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। অন্যদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় আছে কি-না জানা যায়নি। স্বজনরা জানান, ১৩ জুন একটি মামলায় জামিন পান শাহাজান আলী। বন্দি শাজাহান যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বেরুনোর সঙ্গে সঙ্গে সাদা পোশাকে পুলিশ পরিচয়ে জেলগেটে তাকে আটক করে একদল লোক। কিন্তু কোতয়ালী থানায় আশ্রয় হয়নি শাহাজানের। স্বজনরা তাকে কোথাও খুঁজে পাননি। জামায়াতে ইসলামীর এক নেতা বলছেন, ‘মুক্তি পাওয়ার পর শাহাজানকে জেলগেট থেকে পুলিশ পরিচয়ে তুলে নিয়ে গেছে শুনেছি। এখন তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।’ জামায়াতের ওই নেতা আইন-আদালতের প্রতি সম্মান দেখিয়ে শাজাহানকে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের দাবি জানান। যশোর কোতয়ালী থানার ওসি ইলিয়াস হোসেন বলেন, ‘১৪ জুন জেলগেট থেকে শাহাজান আলী নামে কাউকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে কি-না আমার জানা নেই। থানায় কেউ এমন অভিযোগও দেয়নি।’ নিখোঁজ শরিফুল ইসলামের লাশ মর্গে আছে কি-না খোঁজ নিতে এসেছিলেন তার স্বজনরা। এদের মধ্যে তুহিন নামে একজন জানান, শরিফুল বেনাপোল বন্দরে লেবারের কাজ করতেন। ১৩ জুন রাত সাড়ে নয়টার দিকে কাজ শেষে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন তিনি। এর পর থেকে তিনি নিখোঁজ।
বেনাপোল পোর্ট থানার ওসি অপূর্ব হাসান বলেন, ‘শরিফুল ইসলাম নামে কেউ নিখোঁজ আছে বলে জানা নেই। থানায় কেউ এমন অভিযোগ করেনি।’ এর আগে মহিদুল ইসলামকে হাসপাতাল মর্গে খোঁজ করতে আসেন তার স্বজনরা। তারা জানান, কেশবপুর বাজারের পাশে ভাড়া থাকতেন মহিদুল। কেশবপুর পশুহাটে টোল আদায়ের কাজ করতেন তিনি।  তার ভাই ইজাজুল ইসলাম সপরিবারের হাসপাতাল মর্গে এসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন। ইজাজুল বলেন, ‘গত ১৬ মে সন্ধ্যায় বের হওয়ার পর আর বাসায় ফেরেনি মহিদুল। তার নিখোঁজের ব্যাপারে কেশবপুর থানায় সাধারণ ডায়রি করা হয়েছে। শুনলাম হাসপাতাল মর্গে কয়েকটি অজ্ঞাত লাশ আছে। এর মধ্যে আমার ভাই আছে কি-না দেখতে এসেছি।’ মর্গে ভাইয়ের লাশ না পেয়ে বিলাপ করছিলেন ইজাজুল। কাঁদতে কাঁদতে তিনি স্বজনদের নিয়ে বাড়ি ফিরে যান। এ ব্যাপারে কেশবপুর থানার ওসির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ডিউটি অফিসারের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। কিন্তু একাধিক বার চেষ্টা করা হলেও টেলিফোন রিসিভ করেননি ডিউটি অফিসার। হাসপাতাল ছাড়াও প্রতিদিন অনেক মানুষ ভিজ জমাচ্ছেন আদালত এলাকায়। নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে যারা থানায় যেতে পারছেন না, তারা আদালতের কোনো এক কোণায় দাঁড়িয়ে দেখতে চাইছেন, পুলিশের গাড়িতে যে আসামিদের আনা হলো, এর মধ্যে তার নিখোঁজ স্বজন আছে কি-না। কেউবা আবার আবার আইনজীবীদের সেরেস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন কী করা যায় তার পরামর্শ নিতে।

Print
1211 মোট পাঠক সংখ্যা 1 আজকের পাঠক সংখ্যা

About Jessore Express

Close