জাকাতের কাপড় মানেই সস্তা, ‘নিন্দনীয় অপরাধ’ বলছেন আলেমরা

এক্সপ্রেস ডেস্ক: দোকানে ঝলমলে পোশাকের এক কোনে লেখা ‘জাকাতের শাড়ি এখানে’। লাখ টাকার  থ্রি পিস বিক্রি হচ্ছে যেখানে, সেখানেই এক কোনায় সাড়ে তিনশ’ টাকার ভেতর জাকাতের জন্য থরে থরে রাখা শাড়ি। আলেমরা বলছেন, এটা হাদিসবিরোধী কাজ। হাদিস অনুযায়ী, সবচেয়ে উত্তম জিনিসটা আপনি জাকাত দেবেন। আর জাকাত কখনোই দান নয়। যিনি জাকাতের আওতায় এসেছেন তার জন্য সেটা ফরজ। যারা লোক দেখানোর জন্য বেশি মানুষের হাতে সস্তা কাপড় তুলে দেন, সেটা ইসলামের দৃষ্টিতে ‘নিন্দনীয় অপরাধ’।

প্রতি রমজানের শুরুতেই কাপড়ের দোকানের সামনে একটা অদ্ভুত ব্যানার লক্ষ্য করা যায়, যেখানে লেখা থাকে-‘এখানে জাকাতের কাপড় পাওয় যায়।’ এভাবে আলাদা করে লেখার কারণ জানতে চাইলে দোকানি বলেন, ‘জাকাতের কাপড় কম দামে এবং সংখ্যায় বেশি। ধরুন, যার ওপরে এই বছর ১০ হাজার টাকা জাকাত ফরজ হয়েছে, তিনি ওই টাকা দিয়ে ২০টা লুঙ্গি, আর ২০টা কাপড় কিনে আত্মীয়-স্বজন এবং প্রতিবেশীদের মধ্যে যারা গরিব তাদের দিয়ে দেন।’

এই প্রবণতাকে হাদিস বিরুদ্ধ উল্লেখ করে শোলাকিয়া ঈদগাহের খতিব আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ বলেন, ‘জাকাত মানে দশ বিশ টাকা করে হাজার লোককে দেওয়া না। আপনি জাকাত এমনভাবে দেবেন যাতে করে যিনি জাকাত নিলেন, পরবর্তী বছর তাকে আর যেন জাকাত নিতে না হয়। এটা দারিদ্র্য দূরীকরণের একটা পন্থা হিসেবে সমাজে আনা হয়। এখন আপনি যদি দেখানোর জন্য লাইনে দাঁড় করিয়ে হাজার মানুষকে কম দামী কিছু দিয়ে ভাবেন, আপনি জাকাত আদায় করেছেন তাহলে ভুল ভাবছেন। জাকাত কোনও দান নয়, এটা আপনার জন্য ফরজ।’

আলেমরা বলছেন, জাকাত শব্দের সরাসরি অর্থ হচ্ছে পবিত্র হওয়া, সঠিক হওয়া, বৃদ্ধি পাওয়া। যিনি জাকাত দেবেন, তার ধনসম্পদ পবিত্র হবে, বৃদ্ধি পাবে। এবং তার দেওয়া জাকাতের মাধ্যমে কেউ একজন স্বাবলম্বী হয়ে উঠবে। অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে স্বচ্ছল মানুষেরা জাকাত হিসেবে যে সম্পদ সমাজের বিত্তহীন ও গরিব মানুষকে দান করবেন, তার ফলে বিত্তহীন মানুষেরা অর্থপ্রাপ্ত হবেন এবং ক্রমান্বয়ে গোটা সমাজে অভাবী মানুষের সংখ্যা কমে আসবে। কিন্তু যার কাপড় দরকার নেই তাকে আবার একটা শাড়ি দিলে জাকাত আদায় হয় না।

এমনকি কাছের দরিদ্র আত্মীয়স্বজনকে একটু অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে নেওয়ার মাধ্যমেও জাকাত আদায় হয় উল্লেখ করে ফরীদ  উদ্দীন মাসউদ বলেন, ‘অনেক সময় আত্মীয়দের জাকাত দেওয়ার বিষয়ে অস্বস্তি কাজ করে। আপনি জাকাত হিসেবে উল্লেখ করে দেবেন না। গরীব আত্মীয়কে আয়ের উপায় বা তার প্রয়োজনীয় কিছু আপনি উপহার দিতে পারেন। আর আপনার নিয়তে মনে মনে জাকাতের কথা বললেন। সেটাও হয়।

ঈদের বাজারে রোজার শুরু থেকে জাকাতের শাড়ি এসে গেছে। শুরুর দিকে এইসব শাড়ি কেনার তোড়জোর বেশি থাকে বলে জানান চকবাজারের এক দোকানি। তিনি বলেন, ‘ম্যাডামরা এসে গাড়ি ভর্তি করে নিয়ে যান। দেড়লাখ টাকায় যতগুলো শাড়ি হয় মিনিট্রাকে করে নিয়ে যান। এরা সাধারণত ব্যবসায়ী, দেখে বুঝি। এমনিতে চাকুরিজীবী জাকাতদাতারাও আসেন। যারা দশবিশটা শাড়ি কেনেন।’ এই শাড়িগুলো সারাবছর বিক্রি হয় কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সারাবছর এগুলোর বিক্রি কম। এমনিতে শ্রমিকদের ভেতরও শাড়ি পরার প্রবণতা কম। যারা পড়েন তারা একটু ভাল প্রিন্টের টেকসই, কিন্তু দাম কম শাড়ি কেনেন। জাকাতের শাড়িগুলো খুব আরামদায়ক হয় না।’

জাকাতে শাড়ি দেওয়ার বিষয়টি কিভাবে ঘটলো প্রশ্নে মওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ বলেন, ‘আমার মনে হয় মওলানারা যদি ঠিকমতো বিষয়গুলো উপস্থাপন করে জানাতেন এভাবে জাকাত আদায় হয় না, তাহলে এই লাইনে দাঁড় করিয়ে শাড়ি দেওয়া, দশ-বিশ টাকা দেওয়া বন্ধ হবে। এগুলোর জন্য সরকারিভাবে প্রচার প্রচারণাও দরকার আছে।

Print
1301 মোট পাঠক সংখ্যা 1 আজকের পাঠক সংখ্যা

About Jessore Express

Close