ফাইজুল্লাহর জঙ্গি হয়ে ওঠার কাহিনি

এক্সপ্রেস ডেস্ক: সারাদেশে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযানের মধ্যেও মাদারীপুরে সরকারি নাজিমউদ্দিন কলেজের শিক্ষক রিপন মণ্ডলের ওপর সেই একই কায়দায় হামলা হয়েছে। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার কিশোর ফাইজুল্লাহ ফাহিম এখন টক অব দ্য কান্ট্রি। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে জঙ্গি হয়ে ওঠার কাহিনিও বর্ণনা করেছে এই কিশোর। ঠিক কবে থেকে সে নিজেকে জঙ্গি কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করেছে সে ব্যাপারে এখনো মুখ খুলেনি সে। তবে তার মগজ যে ভালোভাবেই ধোলাই করা হয়েছে তা বোঝা গেছে পুলিশকে দেয়া তার বক্তব্যেই। শিক্ষক রিপন মণ্ডলের ওপর হামলার ব্যাপারে তার মধ্যে অনুশোচনার লেশমাত্র নেই। ফাইজুল্লাহ ফাহিম পুলিশকে বলেছে ‘আমি যা করেছি তা আল্লাহ ও ইসলামের জন্যই করেছি।’

পুলিশের সঙ্গে কথা বলে ও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কোনো কারণে ফাইজুল্লাহ ডিসটার্ব ছিল। এই বিষয়টি শেয়ার করতে গিয়েই জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহরীরের সক্রিয় সদস্য জুবায়ের আহমেদদের পাল্লায় পড়ে ফাইজুল্লাহ। পরে তার হাত ধরেই ফাইজুল্লাহ হিযবুত তাহরীর সংগঠনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। এর পর দীর্ঘ সময় ধরে ফাইজুল্লাহর মগজ ধোলাই করা হয়। সরকারের প্রতি তাকে বিষিয়ে তোলা হয়। চাপাতি চালানোর প্রশিক্ষণও দেয়া হয় তাকে।

ফাইজুল্লাহ পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে যে, সরকারকে বিব্রত করতেই এই হামলা চালানো হয়েছে। এছাড়া রিপন মণ্ডলকে সে চেনে না, জানে না। সে শুধু উপরের নির্দেশ পালন করেছে মাত্র। শেষ পর্যন্ত বিদেশ যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে কিছু দিন আগে উধাও হয়ে যায় কিশোর ফাইজুল্লাহ। এরপরই অঘটন।

কেবল ফাইজুল্লাহ নয় এর আগে অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ওয়াশিকুর রহমান বাবু হত্যার ঘটনার সময় যে দুইজনকে জনতা হাতেনাতে ধরে ফেলে তারাও বয়সে কিশোর। তাদের একজন জিকরুল্লাহ ও আরিফুল। এছাড়া ব্লগার রাজীব হত্যার ঘটনায় যাদের ফাঁসি হয়েছে তারাও বয়সে তরুণ।

প্রথম প্রথম জঙ্গি কর্মকাণ্ডে মাদ্রাসা ছাত্রদের জড়িত থাকার কথা শোনা গেলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা এখন ছড়িয়ে পড়ছে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোতেও। এটি একটি নতুন ট্রেন্ড।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) এ কে মোহাম্মদ আলী শিকদার পিএসসি বলেন, এসব ঘটনায় একাধিক কারণ রয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক বৈষম্য, সঠিক শিক্ষার অভাব, শিক্ষিত তরুণদের প্রত্যাশিত কর্মসংস্থানের অভাবই তরুণ ও কিশোরদেরকে জঙ্গিবাদের দিকে ধাবিত করছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শাহ আহসান হাবিব বলেন, ফেসবুক থেকে শুরু করে নানা মাধ্যমে ধর্মের অপব্যাখ্যা চলছে। কিশোর-তরুণ হচ্ছে এর প্রধান শিকার। তাছাড়া বাবা-মা তাদের সন্তানদের দিকে সেভাবে নজর দিতে পারছেন না নানা ব্যস্ততার কারণে। তারা কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে, কী করছে এসব দিকে খেয়াল না করার মাশুল দিতে হচ্ছে সমাজকে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও শিক্ষার্থীদের ওপর সেভাবে নজর রাখছে না। এসব থেকে আমাদেরকে বের হয়ে আসতে হবে।

এই সমাজ বিজ্ঞানী বলেন, এক সময় বাংলাদেশে মাদ্রাসাপড়ুয়া ছাত্ররা জঙ্গি কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তো। এখন বিভিন্ন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইংলিশ মিড়িয়াম স্কুল কলেজের ছাত্রদেরকে অনলাইনসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মাধ্যমে উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে উৎসাহী করছে।তিনি বলেন, জঙ্গিরা এই তরুণদের ধর্মীয় অপব্যাখ্যা দিয়ে বিভ্রান্ত করছে।

গত বুধবার মাদারীপুরের সরকারি নাজিমউদ্দিন কলেজের গণিতের শিক্ষক রিপন মণ্ডলের ওপর হামলা চালায় ফাইজুল্লাহসহ তিনজন। পালিযে যাওয়ার সময় ফাইজুল্লাহকে হাতেনাতে ধরা হয়। হিযবুত তাহরীরের এই সদস্য জিজ্ঞাসাবাদের আরও অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

তবে ফাইজুল্লাহ পুলিশকে জানায়, সরকারকে বিব্রত করতে এই হামলা। ওই শিক্ষকের সঙ্গে তাদের কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ নেই। এমনকি শিক্ষক রিপন চক্রবর্তীকে তারা চিনতোও না। তাদের কাছে নির্দেশ আসতো, তারা সেই নির্দেশ বাস্তবায়ন করেছে। কারা নির্দেশদাতা সেই বিষয়ে কোনো তথ্য আদায় করতে পারেনি পুলিশ।

হামলাকারী ফাইজুল্লাহ ফাহিম তার সঙ্গে থাকা অন্য দুজনের নাম বললেও অভিযানে গিয়ে তাদের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। তবে তাকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদে দেশের জঙ্গি নেটওয়ার্কের ব্যাপারে তথ্য পাওয়া যাবে বলে আশা করছে পুলিশ।

আমাদের দেশে জঙ্গিবাদের প্রভাব নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মেজর জেনারেল (অব.) এ কে মোহাম্মদ আলী শিকদার পিএসসি বলেন, দেশে জঙ্গিবাদের শিকড় অনেক গভীরে। দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদের প্রভাব আমাদের দেশেও পড়ছে। এছাড়া আমাদের শত্রু জঙ্গিবাদের চারণভূমি পাকিস্তান আমাদের দেশে সরাসরি জঙ্গি কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে।

তরুণ প্রজন্মের জঙ্গি কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার দুইটি কারণ উল্লেখ করে এ নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন, জঙ্গি কর্মকাণ্ডে যারা আটক হচ্ছে তাদের পারিবারিক পরিচয় বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে তাদের পরিবার ১৯৭০ সালে স্বাধীনতার ম্যান্ডেটের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে এবং নয়তো ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিল।

মোহাম্মদ আলী শিকদার বলেন, স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত চক্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন অপপ্রচার চালিয়ে তরুণদের মনে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করছে। তারা বলছে, এ সরকারের কাছে ইসলাম নিরাপদ নয়। সরকার ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড করছে এমন অপপ্রচারে তরুণ প্রজন্ম তাতে উদ্ভুদ্ধ হয়ে জঙ্গি কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।

প্রসঙ্গত, মাদারীপুরের সরকারি নাজিমউদ্দিন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের গণিত বিভাগের প্রভাষক রিপন চক্রবর্তীকে বুধবার বিকালে নিজ বাসার দরজায় কুপিয়ে মারাত্মক জখম করে দুর্বৃত্তরা। পালিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয় লোকজন তিনজনকে ধাওয়া করে একজনকে ধরে ফেলে। ওই শিক্ষককে প্রথমে মাদারীপুর সদর হাসপাতালে এবং পরে আশঙ্কাজনক অবস্থা বরিশাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে সফল অস্ত্রোপচার শেষে তার অবস্থা এখন আশঙ্কামুক্ত।

Print
1023 মোট পাঠক সংখ্যা 1 আজকের পাঠক সংখ্যা

About Jessore Express

Close