সাতক্ষীরায় ফাহিম হত্যা : ‘বাঁচতে চাওয়ায় মুখে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় মাটি’

এক্সপ্রেস ডেস্ক: ‘তোমরা আমাকে মেরো না। আমার বাবা মালেয়েশিয়ায় থাকে তোমাদের মাংসের টাকা দিয়ে দেবে। আমার নানা তোমাদের টাকা শোধ করে দেবে তোমরা আমাকে মেরো না’, এভাবে বেঁচে থাকার আকুতি করেছিল শিশু ফাহিম। তবুও মন গলেনি ঘাতকদের। যে মুখে সে বেঁচে থাকার আকুতি করেছিল সে মুখেই ঘাতকরা ঢুকিয়ে দেয় কাদা-মাটি। তারপর নৃশংসভাবে নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয় তাকে। কাঁদতে কাঁদতে এভাবেই কথাগুলো  বলছিলেন নিহত ফাহিমের মা ফয়জুন নাহার।

তিনি আরও বলেন, ঘাতকরা ফাহিমকে হত্যা করে লাশ একটি ঘরে বাক্সের মধ্যে লুকিয়ে রাখে। এরপর রাতের কোনও একসময় ঘাতকদের মধ্যে ইসরাফিল লাশটি নিয়ে পাটক্ষেতে রেখে আসে। এসময় পথ পাহারা দেন ইসরাফিলের পিতা মুজিবর, ভাই ইব্রাহিম ও মা সফুরা বেগম ওরফে পুটি। এছাড়া ইসরাফিলের স্ত্রী তামান্না পরিবারের চাপে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) অবস্থান পাহারা দিচ্ছিলেন। পরবর্তীতে তামান্নার দেওয়া তথ্যে নিহত ফাহিমের স্বজনরা হত্যার রহস্য জানতে পারে বলে জানান নিহত ফাহিমের মা ফয়জুন নাহার। ফাহিমের মায়ের এ দাবির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন সাতক্ষীরা সদর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আবুল কালাম আজাদ। তিনি জানান, নিহত শিশুটির লাশের পাশে থাকা কিছু চিহ্নের সূত্র ধরে হত্যার ঘটনায় সন্দেহভাজনদের খুঁজে বের করে পুলিশ।

এদিকে, সন্দেহভাজন ইস্রাফিলের স্ত্রী তামান্নার বরাত দিয়ে ফাহিমের মা ফয়জুন নাহার আরও বলেন, কুকুরে মাংস খাওয়ার পর খেলার মাঠ থেকে ফাহিমকে ধরে আনে মুজিবুরের বড় ছেলে ইব্রাহিম। এসময় ফাহিমকে ঘুষি মারতে থাকলে সে বেঁচে থাকার আকুতি জানালে তার স্ত্রী ছফুরা বেগম ওরফে পুটি লাথি মারেন ফাহিমের বুকে। এতে পাশে থাকা একটি ভ্যানের চাকার এক্সেলের সঙ্গে সজোরে ধাক্কা খায় শিশু ফাহিম। এতে সে মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পেয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। এক পর্যায়ে প্রচণ্ড বেগে রক্ত বের হতে থাকলে ফেভিকল আঠা দিয়ে রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করে ইব্রাহিম, মুজিবর ও ছফুরা। কিন্তু রক্ত বন্ধ না হওয়ায় এবং ফাহিমের জ্ঞান না ফেরায় তাকে মৃত ভেবে ঘরের মধ্যে খাটের নিচে একটি বাক্সের মধ্যে লুকিয়ে রাখা হয়।

এরপর রাতে ফাহিমের লাশ বাক্স থেকে বের করে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার কুশখালী সীমান্তের একটি পাট ক্ষেতে রেখে আছে ইসরাফিল। ইসরাফিলের বাম পা খোঁড়া হওয়ায় তিনি পায়ের পাতায় ভর দিয়ে হাঁটেন। লাশ নিয়ে পাট ক্ষেতে যাওয়া ও আসার সময় তার সেই পায়ের ছাপ পড়ে মাটিতে। পায়ের ছাপ দেখেই পুলিশ নিশ্চিত হয় নৃশংস এ খুনের সঙ্গে ইসরাফিল ও তার পরিবার জড়িত। এদিকে নিহত ফাহিমের জুতা পড়ে ছিল ইব্রাহিমের মুদি দোকানে। ফাহিমের খেলার সঙ্গী গোলাম হোসেন ও আশিকের মাধ্যমে তাদের বাড়িতে জুতা পাঠিয়ে দিয়ে নাটক শুরু করেন তিনি। এসময় ফাহিমকে খোঁজার জন্য এলাকায় মাইকিং করা হয়। সেই মাইকের ভাড়াও দেন ঘাতক মুজিবর। তবে এ ঘটনার পর আতঙ্কিত হয়ে পড়েন ইসরাফিলের স্ত্রী তামান্না। তামান্না তার বাবার বাড়িতে ফোন করে বলেন, মা আমাকে নিয়ে যাও। এক কেজি মাংসের জন্য আমার শাশুড়ি একটি শিশুকে মেরে ফেলেছে। আমাকেও ওরা মেরে ফেলতে পারে। তোমরা আমাকে নিয়ে যাও।

এসময় তামান্নার কথা শুনতে পান এক প্রতিবেশী। তখনই বেরিয়ে আসে খুনের রহস্য। এ ঘটনায় গত ১৮ জুন গ্রেফতার করা হয় কুশখালী গ্রামের মুজিবর রহমানের স্ত্রী ছফুরা খাতুন, ছেলে ইব্রাহিম হোসেন ও ইসরাফিল হোসেনকে। এছাড়া ইসরাফিল হোসেনের স্ত্রী তামান্না খাতুন ও মুজিবুর রহমানকে আটক করা হলেও তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এদিকে শিশু ফাহিমের নৃশংস হত্যাকারীদের দ্রুত বিচারের দাবিতে মানববন্ধন করেছে এলাকাবাসী। বুধবার বিকেলে হত্যাকারীদে দ্রুত বিচারের সাতক্ষীরা সদরের কুশখালী সীমান্তবর্তী এলাকায় ফাহিমের নানা মোহাম্মদ আলীর বাড়ির সামনে মানববন্ধন ও মিছিল করে তারা। এসময় এলাকাবাসী সিলেটের শিশু রাজন ও খুলনার রাকিব হত্যার দ্রুত বিচারের উদাহারণ টেনে মাত্র এক কেজি মাংসের জন্য যারা ফাহিমকে হত্যা করেছে তাদের দ্রুত বিচার দাবি করেন।

সাতক্ষীরা সদর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আবুল কালাম আজাদ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, নিহতের চাচা বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। এ ঘটনায় তিনজনকে আটকও করা হয়েছে এবং আটকদের সাতক্ষীরা চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ৭ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছে। প্রসঙ্গত, দু’দিন নিখোঁজ থাকার পর গত ১৫ জুন সন্ধ্যায় সাতক্ষীরা সদর উপজেলার কুশখালী সীমান্ত সংলগ্ন একটি পাট ক্ষেত থেকে শিশু ফাহিমের মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ফাহিম সদর উপজেলার মৃগিডাঙ্গা গ্রামের মালয়েশিয়া প্রবাসী মনিরুল ইসলামের ছেলে। মায়ের সঙ্গে সে কুশখালী গ্রামে নানা হাজী মোহাম্মদ আলীর বাড়িতে থাকতো।

Print
1927 মোট পাঠক সংখ্যা 1 আজকের পাঠক সংখ্যা

About Jessore Express

Close