নিখোঁজ কাহিনী: সাইকেল নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে যায় পাইলট রাতুল

এক্সপ্রেস ডেস্ক: ঈদের দিন বাবার সঙ্গে নামাজ আদায় করেছিলো রাতুল। পরদিনও ঈদের আমেজ ছিলো বাসায়। কিন্তু কোনও এক কারণে মনটা খারাপ ছিলো রাতুলের। অন্যদিন প্রাইভেটকার নিয়ে বের হতো সে। কিন্তু সেদিন বিকেলে বাইসাইকেল নিয়ে বের হয়। সেদিন ছিলো ২০১৫ সালের ১৯ জুলাই। সন্ধ্যার আগেই বাসায় ফেরার কথা ছিলো। অন্যান্য দিনও তাই করতো। কিন্তু সেদিন আর বাসায় ফেরেনি। তারপর বছর পেরিয়ে গেছে। গত মঙ্গলবার এক বছর পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু ফেরেনি মাহমুদুল আহসান রাতুল।

মঙ্গলবার জঙ্গি সন্দেহে র‌্যাব যে নিখোঁজ ২৬২ জনের তালিকা প্রকাশ করেছে, সেখানে রয়েছে রাতুলের নাম। তবে পরিবারের সদস্যরা এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না রাতুল জঙ্গি কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হতে পারে।

বুধবার রাজধানীর আদাবরের বায়তুল আমান হাউজিংয়ের ১০ নম্বর সড়কের ৮৪৫ নম্বর বাসায় গিয়ে কথা হয় রাতুলের বাবা-মায়ের সঙ্গে। তারা এখনও ছেলের অপেক্ষায় পার করছেন প্রতিটি মুহূর্ত। পরিবারের বড় সন্তান হঠাৎ করে কাউকে কিছু না বলে নিখোঁজ হয়ে যাবে এমনটা তারা মানতে পারছেন না কোনওভাবেই।

রাতুলের বাবা প্রকৌশলী রওশন আলী খান জানান, তার ছেলে মোহাম্মদপুর সরকারি বয়েজ স্কুল থেকে গোল্ডেন জিপিএ পেয়ে ২০১০ সালে এসএসসি পাস করে। এরপর ভর্তি হয় নটরডেমে।

সেখান থেকেও কৃতিত্বের সঙ্গে এইচএসসি পাস করে ২০১২ সালে। তারপর ভর্তি হয় এরির‌্যাং ফ্লাইং স্কুল অ্যান্ড একাডেমিতে। সেখানেও পাইলট হওয়ার তিন বছরের কোর্স সাফল্যের সঙ্গে শেষ করে। তারপর সিভিল এভিয়েশনে পরীক্ষা দিয়ে পাইলটের সনদও পায়। কিন্তু কোথাও যোগ দেয়নি। ক্যারিয়ার যখন শুরু হওয়ার কথা তখনই একদিন বাসা থেকে বেরিয়ে যায় সে।

রাতুলের মা উম্মে হাবিবা আলেয়া জানান, সেদিন রাতুলের ঘাড়ে একটি ছোট্ট ব্যাগ ছিলো। মোবাইল দুটোও নিয়ে যায় সঙ্গে। রাতে যখন ফেরেনি তখন রাতুল একবার বলেছিলো সে মিরপুর ডিওএইচএসে বন্ধু ইমরানের সঙ্গে আছে। তারপর আরও ঘণ্টাখানেক পর ফোন দিলে সে জানায় বনানীতে আছে। কিন্তু কার বাসায় বা কার সঙ্গে আছে তা বলেনি সে। শুধু বলেছিলো ‘আমার বাসায় ফিরতে একটু দেরি হবে’।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে এই মা বলেন, ‘একটু দেরি যে বছর পেরিয়ে যাবে আমরা তো তা আর বুঝতে পারিনি। ছেলেটা কোথায় আছে? কী করছে? বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে কিচ্ছু জানতে পারছি না।’

বাবা রওশন আলী খান জানান, তিনি বুঝতে পারছেন না তার ছেলে জঙ্গি কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়েছে কি না। বাসায় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তো ঠিক, কিন্তু উগ্রপন্থী কোনও গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ ছিলো বলে কখনও মনে হয়নি। বাসায় কখনও বন্ধুরাও তেমন আসতো না। তবে কিছুটা অন্তর্মুখী ছিলো। কেন সে বাসা থেকে বেরিয়ে গেলো তা অনুমানও করতে পারছেন না তিনি।

রওশন আলী খান বলেন, ‘নিখোঁজের দুদিন পর আমরা আদাবর থানায় গিয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি করি। পুলিশ কিছু খোঁজ-খবরও করেছে। কিন্তু রাতুলকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।’

রওশন আলী বলেন, ‘পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে গিয়েছি। র‌্যাব মহাপরিচালক বরাবর আবেদনও করেছিলাম। কিন্তু তরুণ একজন ছেলে বাসা থেকে চলে যাওয়ার বিষয়টি তারা তেমন গুরুত্ব দেয়নি।’

রাতুলের স্বজনরা জানান, যেদিন রাতুল বাসা থেকে বেরিয়ে যায়, সেদিন সে ফেসবুকে এক বান্ধবীর সঙ্গে তোলা ছবি আপলোড করে। সায়েদা নামে ওই বান্ধবী তার সঙ্গেই পাইলটের কোর্স করেছিলো। তার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক ছিলো রাতুলের। কিন্তু তার সঙ্গে রাতুলের কোনও বিশেষ সম্পর্ক ছিলো কি না তা জানাতে পারেননি তারা। প্রেমের সম্পর্কের কথা অস্বীকার করেছেন বিদেশি একটি এয়ারলাইনে কর্মরত সায়েদাও।

তিনি বলেন, রাতুলকে কখনও মনে হয়নি যে সে উগ্রপন্থী কোনও দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছে। নামাজ-কালাম পড়তো, কিন্তু জঙ্গি কাজে জড়িয়ে পড়তে পারে তেমনটা মনে হয়নি।

সায়েদা বলেন, আমার সঙ্গে ওর ভালো সম্পর্ক ছিলো। আর নিখোঁজ হওয়ার দিন আমিসহ যে ছবিটা ও ফেসবুকে আপলোড করেছিলো তা আরও আগে তোলা।

সায়েদা বলেন, ‘পাইলট কোর্স শেষ করার পর চাকরি না পাওয়ায় ও একটু হতাশ ছিলো। কিন্তু নিখোঁজ বা নিরুদ্দেশ হওয়ার মতো কিছু হয়নি।’

আদাবর থানার ওসি শেখ শাহীনুর রহমান বলেন, ‘ছেলেটির সর্বশেষ কি অবস্থা তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি। বনানী থেকে একটি ট্রেনে কাটা লাশ উদ্ধার হয়েছিলো এবং পাশে একটি সাইকেল ছিলো বলে শোনা গেছে। কিন্তু তা রাতুলের কিনা তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।’ বিষয়টি এখনও তদন্তাধীন রয়েছে বলে জানান তিনি।

Print
821 মোট পাঠক সংখ্যা 1 আজকের পাঠক সংখ্যা

About Jessore Express

Close