আগামী নির্বাচনে সবাই আসবে: প্রধানমন্ত্রী

আগামী সংসদ নির্বাচনে সব দল অংশ নেবে বলে আশা করছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত সব দল মেনে নেবে বলেও প্রত্যাশা করছেন তিনি। একই সঙ্গে বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষে আগামী নির্বাচন হবে-সেই কথাটিও মনে করিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

বর্তমান সরকারের টানা দ্বিতীয় মেয়াদের তিন বছর পূর্তির দিন সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে এই কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। আগামী নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনে অংশ নেবেন এবং দেশে গণতান্ত্রিক ধারাকে সমুন্নত রাখতে সহায়তা করবেন।’

সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় এই ভাষণ প্রচার করা হয় রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল বিটিভিতে। সব কটি বেসরকারি টেলিভশনও এই ভাষণ বিটিভির মাধ্যমে প্রচার করে।

এই ভাষণে বিএনপি-জামায়াত জোটের দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন, ভোটে জিতে এসে সরকার গঠন, বিভিন্ন খাতে উন্নয়নের বিস্তারিত বর্ণনা দেন।

বিএনপি-জামায়াত জোটের সহিংস আন্দোলনের মুখে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির ভোটে জিতে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। ওই বছরের ১২ জানুয়ারি শপথ নেয় মন্ত্রিসভা। এর আগে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের ভোটে জয়ের পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোটের মন্ত্রিসভায় শপথ নেয় পরের বছরের ৮ জানুয়ারি। ফলে বর্তমান সরকার কার্যত আট বছর ধরে ক্ষমতায় রয়েছে।

নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির সংলাপের বিষয়টিও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, আশা করি সকল রাজনৈতিক দল মহামান্য রাষ্ট্রপতির উদ্যোগে গঠিন নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থা রাখবেন।

সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা চলতি মেয়াদের তিন বছর অতিক্রম করলাম। আমাদের নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। জনগণের প্রতি আমাদের পূর্ণ আস্থা আছে।

দশম সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গ

কোন পরিস্থিতিতে বিএনপি-জামায়াত জোটের বর্জনের মুখে সরকার নির্বাচন করেছিল তারও বর্ণনা দেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, দেশের সর্বোচ্চ আদালত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়। তিনি বলেন, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আমরা অবৈধ পথে ক্ষমতা দখলের পথ রুদ্ধ করেছি।

দশম সংসদ নির্বাচন সব দলের অংশগ্রহণে করতে সব চেষ্টা করা হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনের আগে আমরা জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনকালীন একটি জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলাম। কারণ আমরা সবসময়ই সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে। সংবিধানের আওতায় আমরা সবধরণের ছাড় দিতেও প্রস্তুত ছিলাম। এমনকি বিএনপি যে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিতে ইচ্ছুক, তাও আমরা দিতে চেয়েছিলাম।

নির্বাচন বানচালে বিএনপির আন্দোলনকে ত্রাসের রাজত্ব হিসেবে বর্ণনা করেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, উনি (খালেদা জিয়া) সন্ত্রাসীবাহিনী লেলিয়ে দিয়ে সারাদেশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করলেন। পেট্রল বোমা, অগ্নিসংযোগ ও বোমা হামলা করে মানুষ হত্যায় মেতে উঠলেন। শতাধিক মানুষ হত্যা করলেন। হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ ধ্বংস করলেন।

বিএনপি-জামায়াত জোট নির্বাচন বর্জন করলেও ওই নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দল এবং প্রার্থী অংশ নেয় বলে দাবি করেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, নির্বাচনের সময় প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নির্বাচন কমিশনের অধীনে ন্যস্ত ছিল। সরকার কোন ধরণের হস্তক্ষেপ করেনি।’

সরকারের এক বছর পূর্তিতে বিএনপি-জামায়াত জোটের সরকার পতনের আন্দোলন নিয়েও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। বিএনপি-জামায়াত জোটের আন্দোলনকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখছেন তিনি। বলেন, জনগণ এ ধরণের কর্মকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি দেখতে চান না।

আওয়ামী লীগ কথায় নয়, কাজে বিশ্বাসী

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষের উন্নয়ন এবং কল্যাণের জন্য আমরা আমাদের চেষ্টার ত্রুটি করিনি। সরকার দেশবাসীর প্রত্যাশা কতটুকু পূরণ করতে পেরেছে সে ভার জনগণের ওপরই ছেড়ে দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালনা থেকে শুরু করে এ দেশের যত উল্লেখযোগ্য অর্জন, তার সবগুলো এনেছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিপুল জনসংখ্যার এদেশে সম্পদের পরিমাণ সীমিত। দীর্ঘকাল দেশে কোন আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন হয়নি। বহু সমস্যা পুঞ্জিভূত হয়ে পাহাড়-সমান হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মোকাবেলা করতে হয়েছে অভ্যন্তরীণ বিরুদ্ধ পরিবেশ। বৈশ্বিক বৈরি অর্থনৈতিক অবস্থাও উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বার বার।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সব বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে। বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের সর্বজনীন মডেল। দ্রুত সময়ের মধ্যে দারিদ্র্য হ্রাসে বাংলাদেশের সাফল্যকে বিশ্বব্যাংক মডেল হিসেবে বিশ্বব্যাপী উপস্থাপন করছে।

এই বাংলাদেশ সেই বাংলাদেশ নয়

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরের আট বছরে ব্যাপক উন্নয়নের দাবি করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আট বছর আগের বাংলাদেশ আর আজকের বাংলাদেশ এক নয়। আজকের বাংলাদেশ আত্মপ্রত্যয়ী বাংলাদেশ।

২০০৯ সালে আমরা আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় বিদ্যুতের নাজুক পরিস্থিতির কথাও বর্ণনা করেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, তখন বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল তিন হাজার ২০০ মেগাওয়াট। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় ১৫ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট। দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, অর্থনৈতিক অগ্রগতির সূচকে বিশ্বের শীর্ষ পাঁচটি দেশের একটি আজ বাংলাদেশ। অর্থনীতি ও সামাজিক সূচকের অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা দক্ষিণ এশিয়ার এবং নিম্ন-আয়ের দেশগুলিকে ছাড়িয়ে গেছি।

দারিদ্র্য বিমোচন, মানুষের আয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে রাখা, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং বিপুল সংখ্যক নতুন চাকরি তৈরির কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। বলেন, ‘বিগত আট বছরে দেশ-বিদেশে প্রায় দেড় কোটি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। নতুন ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল হলে আরও এক কোটি নতুন চাকরি হবে।

এই সরকারের মেয়াদে পাঁচ কোটি মানুষ নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে উন্নীত হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। বলেন আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত এক লাখ ৪০ হাজার পরিবারকে সরকার পুনর্বাসন করেছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। বলেন, ২০১৯ সালের মধ্যে আরও দুই লাখ ৮০ হাজার পরিবার পুনর্বাসন করা হবে।

বর্তমান সরকারের আমলে শিক্ষায় ব্যবস্থায় আমুল পরিবর্তন হয়েছে দাবি করে প্রধানমন্ত্রী বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ কর্মসূচির কথা উল্লেখ করেন। বলেন, গত আট বছরে সর্বমোট প্রায় ২২৫ কোটি ৪৩ লাখ এক হাজার ১২৮টি বই বিতরণ করা হয়েছে। বিশ্বে বিনামূল্যে বই বিতরণের এমন নজির নেই।’

যোগাযোগ খাতে ব্যাপক উন্নয়নের দাবি করেন প্রধানমন্ত্রী। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতুর নির্মাণ কাজ উল্লেখ করে তিনি বলেন, দ্বিতীয় কাচপুর, দ্বিতীয় মেঘনা এবং দ্বিতীয় গোমতি সেতু নির্মাণের কাজ শিগগিরই শুরু হবে।’

রেল, নৌপথ ও বিমানের আধুনিকায়নের সরকার উদ্যোগ নিয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইলেকট্রিক ট্রেন ও পাতাল ট্রেনের সম্ভ্যবতা যাচাইয়ের কাজ চলছে। তিনি বলেন, এক সময়ের মৃতপ্রায় মংলা বন্দর আমাদের সরকারের সময়ে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। দক্ষিণের জেলা পটুয়াখালীতে পায়রা সমুদ্র বন্দরের কার্যক্রম শুরু হওয়ার ফলে ঐ অঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মকা- বৃদ্ধি পাচ্ছে। পায়রা বন্দরের সঙ্গে সরাসরি রেল যোগযোগ স্থাপনের কার্যক্রম শুরু হয়েছে।’

বিমানের জন্য ছয়টি সুপরিসর উড়োজাহাজ সংগ্রহ করা হয়েছে জানিয়ে ২০১৮ সালের মধ্যে আরও চারটি উড়োজাহাজ সংগ্রহের কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। বলেন, মাদারীপুরে বঙ্গবন্ধু আর্ন্তজাতিক বিমানবন্দরের নির্মাণের সমীক্ষার কাজ শিগগিরই শুরু হবে।

ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে তথ্য প্রযুক্তি খাতে উন্নয়ন, বৈদেশিক বিনিয়োগ চার গুণেরও বেশি বৃদ্ধির বিষয়টিও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

সরকার দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী করেছে দাবি করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করছে। দুর্নীতি প্রতিরোধে তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সরকার জাতীয় সংসদকে সকল কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিরোধীদল (জাতীয় পার্টি) বিভিন্ন বিষয়ে তাদের অভিমত দিচ্ছেন, আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন। স্থানীয় সরকারকেও এই সরকার শক্তিশালী করেছে বলেও দাবি করেন তিনি।

ভারতের সঙ্গে স্থল সীমানা চুক্তি বাস্তবায়ন এবং মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমারও শান্তিপূর্ণ সমাধানের কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, এরফলে বিশাল সমুদ্র এলাকায় সমুদ্রসম্পদ আহরণের পথ সুগম হয়েছে। যা জাতীয় অর্থনীতিতে বিশেষ অবদান রাখবে।

জঙ্গিবাদ প্রসঙ্গ

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশ যখন এগিয়ে যাচ্ছে, তখন একটি গোষ্ঠী ইসলামের নামে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশে অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করার অপচেষ্টা করছে|’ তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ তবে ধর্মান্ধ নয়। হাজার বছর ধরে এ দেশের মাটিতে সকল ধর্মের মানুষ সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে শান্তিতে বসবাস করে আসছেন। যারা এই ধর্মীয় সম্প্রীতি নষ্ট করতে চায়, তাদের ঠাঁই বাংলার মাটিতে হবে না।’

Print
909 মোট পাঠক সংখ্যা 5 আজকের পাঠক সংখ্যা

About Jessore Express

Close